rockland bd

প্রযুক্তি দুনিয়ায় শীতল যুদ্ধ শুরু?

0

মোহাঃ হারুন-উর-রশিদ :
যুদ্ধ শব্দটা শুনলেই আমাদের মনের ভেতর এক ধরনের অজানা আশঙ্কা কাজ করে। ভয় আর ভয়াবহতার চিত্র মনের কোণে উুঁকি ঝুঁকি দেয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এরকম ভয়াবহ নির্মম কিছু ছবি ভাইরাল হয় মাঝে মধ্যে। বিশ্ব বিবেক কেঁপে ওঠে কিন্তু নড়ে ওঠে বলে মনে হয় না। পৃথিবী জুড়ে স্বার্থ আর নিরাপত্তার নামে চলা যুদ্ধে-মানুষ নিধন চলছেই। প্রত্যক্ষ এসব যুদ্ধের আড়ালে আবার জোড়সোড়ে শুরু হতে যাচ্ছে নতুন এক শীতল যুদ্ধ।


শীতল যুদ্ধ বা স্নায়ুযুদ্ধ হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পঞ্চাশের দশক থেকে আশির দশকের শেষ দিক পর্যন্ত সময়টিতে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে কমিউনিজম আর যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের নেতৃত্বে ক্যাপিটালিজমের মধ্যে চলা এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। যা ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। কিন্তু বাস্তবে তা রবীন্দ্রনাথের ছোট গল্পের সজ্ঞার মতো, ‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’ অবস্থায় বর্তমান পৃথিবীতে বিরাজ করছে। এই শীতল যুদ্ধে পৃথক পৃথক দুটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে রেষারেষি ও প্রতিযোগিতা বিশ্বকে দুইটি পৃথক ব্লকে ভাগ করে ফেলেছিল। আর সম্প্রতি আমরা যুক্তরাষ্ট্র আর চীনের মধ্যে নতুন ধরনের শীতল যুদ্ধের আভাস পাচ্ছি।

মজার ব্যপার হল, পৃথিবীর একমাত্র দেশ চীন এই দুটি মতবাদ কমিউনিজম ও ক্যাপিটালিজমকে তার মতো করে আপন করে নিয়েছে। রাজনৈতিক দিক দিয়ে দেশটি কমিউনিজমের উৎকৃষ্ট উদাহরণ আবার অর্থনৈতিক দিক দিয়ে সে ক্যাপিটালিজমের বড় উদাহরণ। এক্ষেত্রে চীন অতি নিকট ভবিষ্যতে নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠ হতে যাচ্ছে। এখানেই যত সমস্যার মূল। ক্যাপিটালিজমের বর্তমান মোড়ল যুক্তরাষ্ট্র চীনের এই উৎথানকে কোন ভাবেই মেনে নিতে পারছে না। আবার ঠেকিয়েও রাখতে পারছে না। আমেরিকার অবস্থা হলো-শ্যাম রাখি না কুল রাখি, পর্যায়ের। কারণ চীনের সাথে ঝামেলায় তারও অবশ্যই অনেক ক্ষতি হবে। আবার বিষয়টিকে সে-ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি, বলে উপেক্ষাও করতে পারছে না।

২০১৩ সাল থেকে চীন তার ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ প্রকল্প নিয়ে এগুচ্ছে। এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের ৬০টি দেশকে যুক্ত করে চীন তার চারপাশ ঘিরে স্থল ও জল পথে নতুন এক বাণিজ্য পথ খুলতে সচেষ্ট। ইতিহাসের রঙের প্রলেপ দিয়ে এক বলা হচ্ছে ‘সিল্করুট’। প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং এই ‘ওয়ান বেল্ট-ওয়ান রোড’ কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে চীনকে বিশ্ব বাণিজ্যের চালকের আসনে বসাতে তৎপর। নতুন এই সিল্করুটের সাথে সংশিষ্ট দেশগুলোকে চীন অবকাঠামো উন্নয়নসহ নানান খাতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ঋণ দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীনের এই ঋণ আদতে একটি ফাঁদ, ভূরাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করতে চীন তা ব্যবহার করবে। চীনের ঋণ যে ঋণফাঁদ তার বড় উদাহরণ হল, শ্রীলঙ্কার দক্ষিণের হামবানতোতায় নির্মিত গভীর সমুদ্র বন্দর। চীনা ঋণে নির্মিত এই বন্দরটি শ্রীলঙ্কা চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না মার্চেন্টস হোল্ডিংসের কাছে ৯৯ বছরের জন্য ইজারা দিতে বাধ্য হয়েছে, চীনা কিস্তির টাকা শোধ দিতে না পেরে। চীনা ঋণে জর্জরিত দেশগুলি স্বাভাবিক নিয়মেই আমেরিকার পকেট থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্র তা কোন ভাবেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। এতা গেল বাস্তব দুনিয়া। প্রযুক্তি দুনিয়ায়ও যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে শেষ হতে চলেছে।

ফলশ্র“তিতে, সম্প্রতি সময়ের সব আমেরিকান প্রেসিডেন্ট চীনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন। সারা বিশ্বে চীনের একক বাণিজ্য আধিপত্য রুখতে তারা কার্যকরি পদক্ষেপ নেবেন, নির্বচনের সময় এই প্রতিশ্র“তি ও যুদ্ধের ঘোষণা দিতে দেখা যায় সব আমেরিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের। মজার ঘটনা হল, সাধারণত নির্বচনী প্রচারণার সময় যেসব নির্বাচনী ক্যাপ মাথায় দিয়ে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থীরা চীনের বিরুদ্ধে বাণিজ্য যুদ্ধের ঘোষণা দেন-সেই ক্যাপটিও সাধারণত হয় চীনের তৈরী। অর্থৎ বিষয়টা দাঁড়ায় পা থেকে মাথা পর্যন্ত চীনা পণ্য পরিধান করে, চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা।

এরই ধারাবাহিকতায় গত বারের নির্বাচনেও বর্তমান আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের বিরুদ্ধে বাণিজ্য যুদ্ধ ঘোষণার প্রতিশ্র“তি দিয়েছিলেন। এবং তিনি তার কথা রেখে-তা শুরু করেছেন। সম্প্রতি চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়েকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে এনটিটি লিস্টে ঢুকিয়েছেন ও কালো তালিকাভুক্ত করেছেন। ফলে এখন থেকে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে প্রতিষ্ঠানটিকে যন্ত্রাংশ বিক্রি করতে সরকারের অনুমতি নিতে হবে। গুগল ইতমধ্যে হুয়াওয়েকে তার প্রযুক্তির সেবা ও সুবিধা দিতে অস্বকৃতি জানিয়েছে।

এই সমস্যর শুরু যেখানে। ২০১৪ সালে! সেমিকন্ডাক্টর চিপ খাতে ১৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দেয় চীন। এবং ২০১৫ সাথে ‘মেড ইন চাইনা টুয়েন্টি টুয়েন্টি ফাইভ’ নামে একটি জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা পেশ করে দেশটি। প্রযুক্তি খাতে চীনের এই উন্নত প্রযুক্তি শিল্প তৈরীর লক্ষ্যকে শুরুতে আটকে দেওয়ার সিন্ধান্ত নেয় তৎকালীন ওবামা প্রশাসন। চীনের বাজারে মার্কিন প্রযুক্তি জায়েন্ট ইনটেলকে পণ্য বিক্রিতে বাধা দেওয়া হয়। চীনা প্রতিষ্ঠান যাতে সহজে কোন চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানকে অধিগ্রহণ করতে না পারে সাথেসাথে এই ব্যবস্থাও করে মার্কিন প্রশাসন। সম্প্রতি ওবামা প্রশাসনের গৃহীত ব্যবস্থাকে আরও শক্তপোক্ত করলো ট্রাম্প প্রশাসন।


ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদন মতে, মূলত মাইক্রোচিপের বাজার দখল নিয়েই এই লড়াই। চিপ তৈরীতে এত দিন শুধু মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো একচ্ছত্র আধিপত্য দেখিয়েছে। এর বড় উদাহরণ-ইনটেল। কিন্তু এখন চিপের রাজ্যে চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো হানা দিচ্ছে। প্রযুক্তি দুনিয়ায় শুরু হয়ে গেছে ‘চিপযুদ্ধ’। চিপযুদ্ধ শুরু হওয়ায় চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো স্বনির্ভর হওয়ার চেষ্টা শুরু করেছে। আলিবাবা,বাইদু ও হুয়াওয়ে চিপ তৈরীতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।

হুয়াওয়ে কে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে আসছেন ট্রাম্প। গত বছর হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ আনে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রে ফাইভজি সেবার কাজে হুয়াওয়েকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দেশটি। নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা বলে হুয়াওয়ের ফাইভজি প্রযুক্তি ব্যবহার না করতে অনেক দেশকে চাপ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। যদিও হুয়াওয়ের আগে আর এক চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান জেডটিই এর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ ছিল ও আছে।

বিষয়টা অনেকটা ট্রান্সফরমারস: ডার্ক অব দ্য মুন সিনেমার ঐ দৃশ্যটির মতো। জেরির টেবিলে থাকা কম্পিউটার হঠাৎ একটা রোবট পাখি হয়ে বলল, জেরি ইউ আর মাই ফেবারিট, তুই উইকি উইকিকে কী বলেছিস? যুক্তরাষ্ট্রের সন্দেহটাও ঠিক এরকম। তারা ভাবছে টেলিযোগাযোগ খাতে ব্যবহৃত চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর সরবরাহকৃত পণ্যে ও প্রযুক্তির মাধ্যমে চীনা সরকার সে দেশে গুপ্তচরবৃত্তি করছে ও গুরুত্বপূর্ণসব তথ্য হাতিয়ে নিচ্ছে। ট্রাম্পের মতে, হুয়াওয়ে খুব বিপদজনক। নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ ও সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে তাদের বিপদের মাত্রা বোঝা যায়।

হুয়াওয়ের প্রতিষ্ঠাতা রেন ঝেংফেই যদিও বলেছেন মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় তার প্রতিষ্ঠানের কিছু আসে যায় না। তিনি বলেন, বিশ্ব হুয়াওয়ে ছাড়া চলতে পারবে না। কেননা, আমাদের প্রযুক্তি অন্য সবার চেয়ে উন্নত। এরই মধ্যে হুয়াওয়ে তার নিজস্ব অপারেটিং সিস্টেম ‘হংমেং’ ব্যবহারের ঘোষণা দিয়েছে। আর চীনারা তো অনেক দিন থেকেই তাদের নিজস্ব ধরণের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ব্যবহার করছে।

যুক্তরাষ্ট্র-চীন চলমান বাণিজ্যযুদ্ধ নিয়ে চীনের বাণিজ্যমন্ত্রী জং শান-এর বক্তব্য প্রনিধানযোগ্য। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যেকোন ধরনের বাণিজ্য যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতির জন্য কেবল দুর্যোগই ডেকে আনবে। এ যুদ্ধে কেউ জয়ী হবে না। এর ফলে চীন-যুক্তরাষ্ট্র শুধু নয়, সারা বিশ্বই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ঠিক তাই, ক্ষতি সবারই হবে।

আমেরিকানদের কাছে ট্রাম্পের যে প্রতিশ্র“তি- মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন, তা তিনি বাস্তবায়ন করতে চান। প্রশ্ন হল, তা কিভাবে? আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, তিনি মেড ইন আমেরিকার ওপর বেশি জোর দিচ্ছেন। প্রেসিডেন্ট ট্্রাম্প তার দেশের সব কোম্পানিকে আমেরিকায় কারখানা স্থাপন ও বিদেশে অবস্থিত তাদের কারখানাগুলোকে দেশে ফিরিয়ে আনার কথা বলছেন। যা অর্থনৈতিক বাস্তবতায় অসম্ভব। অনেকে মজা করে বলেন এই ক্ষাপাটে প্রেসিডেন্ট আমেরিকাকে গ্রেট করতে গিয়ে গভীর সমুদ্রে ডুবাবে। আর চীনের সাথে তার বাধানো বাণিজ্যযুদ্ধ শীতল যুদ্ধে রূপ নিয়ে বিশ্বের প্রতিটি মানুষকে দুইভাগে ভাগ করে ফেলবে। নিকট ভবিষ্যতে আমাদের হয়তো মেড ইন চাইনা অথবা মোডে আমেরিকা এর যে কোন একটিকে বেছে নিতে হবে।

Comments are closed.