rockland bd

ওরা আলোকিত মানুষ হওয়ার স্বপ্ন দেখে

0


সারওয়ার আলম মুকুল, কাউনিয়া (রংপুর) প্রতিনিধি :
অভাব ওদের নিত্য সঙ্গী। দরিদ্রতা ওদের নিয়তি। নানা প্রতিকূলতার সাথে লড়াই করে জীবন যুদ্ধে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন ওদের চোখে মুখে। এসএসসি ও দাখিল পরীক্ষায় ভালো ফল করেও উচ্চ শিক্ষা কিভাবে গ্রহন করবে, অর্থের যোগান হবে কী ভাবে সে চিন্তায় ওদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। সমাজের বিত্তবানদের একটু সহানুভুতিই পারে কাউনিয়ার ৬ অদম্য মেধাবীদের আলোকিত মানুষ হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে।

আঃ জব্বার : পেটে ভাত জোটে না, পরনে চাহিদা মতো কাপড় থাকেনা। দারিদ্রতা আর নানা প্রতিকুলতার সাথে যুদ্ধ করে কাউনিয়া দরদী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে আঃ জব্বার জে এসসি পরীক্ষাতেও গোল্ডেন জিপিএ ৫ পেয়েছিল সে। উপজেলার সারাই জাগরণ পাড়া গ্রামের বিড়ি তৈরির মজুর সাদেকুর রহমান ও গৃহিনী মোছাঃ নাদিরা বেগমের পুত্র সে। ওরা ২ভাই ২ বোন। ৫শতক বাড়ি ভিটা ছাড়া আর কিছু নেই। বাবার দিন মজুরে চলে সংসার, সে ও তার ভাইয়ের পড়া লেখার খরচ বিভিন্ন বাড়িতে প্রাইভেট পড়িয়ে এতোদিন জুগিয়েছে । দরিদ্রতার কারনে বোনের বিয়ে দিয়ে দিয়েছে। ছেলের অনেক স্বপ্ন লেখাপড়া শিখে বড় হবে। কিন্তু সেই স্বপ্নের অর্থের যোগান হবে কি ভাবে ? আঃ জব্বারের শিক্ষার প্রদীপও নিভে যেতে বসেছে। তার স্বপ্ন পূরনে এখন বড় বাঁধা দারিদ্রতা। এ বাঁধা ডিঙ্গিয়ে সেই স্বপ্ন পূরন হবে কিনা সে চিন্তাই এখন সারাক্ষন জব্বারের। সে ইঞ্জিনিয়ার হতে চায় সমাজের বৃত্তবানরাই পারে তার স্বপ্ন পুরন করতে।

মোনায়েম হোসেন : কাউনিয়া উপজেলার ইমামগঞ্জ স্কুল এন্ড কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে অংশ নিয়ে জিপি এ-৫ পেয়েছে মোনায়েম হোসেন। উপজেলার নাজিরদহ গ্রামের গুড়া-ভূষির দোকানী দরিদ্র আঃ মতিন ও গৃহীনি মমতাজ বেগম এর পুত্র সে। চরম অর্থ সংকটের মাঝেও এবার এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে সে। পিইসি ও জেএসসিতে সে জিপিএ -৫ পেয়েছিল । দরিদ্রতার সাথে লড়াই করে এসএসসি পাস করলেও উচ্চ শিক্ষা গ্রহন নিয়ে এখন দুচিন্তায় পড়েছে মোনায়েম হোসেন । তার এক বোন ও ভাই পড়ালেখা করে। বড় বোন ইন্টারে পড়ে । তাদের শিক্ষার খরচ জুটবে কিভাবে এচিন্তায় বিভোর তার বাবা-মা। সে এতো দিন পড়াশুনার খরচ চালিয়েছে বিভিন্ন বাড়িতে প্রাইভেট পড়িয়ে। জমি জিরাত যা ছিল তা সব রাক্ষুশি তিস্তা নদী গিলে খেয়েছে। বাড়ি ভিটা ছাড়া এখন আর কিছু নেই। সামনে এগিয়ে যাওয়ার নিরন্তর সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে সে। মা মমতাজ বেগম ছেলের সাফল্যে খুশি হলেও ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। ছেলে চায় ডাক্তার হতে, কিন্তু দরিদ্র পরিবারের পক্ষে কিভাবে তা সম্ভব। সংসারে একজন মাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল ৫ জনের সংসার। তিনি ছেলের জন্য সকলের কাছে দোয়া ও সহযোগিতা কামনা করেছেন।

খাদিজাতুল কোবরা : শারিরীক প্রতিবন্ধী শ্রমিক মোঃ খলিলুর রহমানের কন্যা খাদিজাতুল কোবরা পিইসি ও জেএসসির পরীক্ষার ন্যায় চলতি বছর কাউনিয়া মোফাজ্জল হোসেন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পরীক্ষার অংশ নিয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে। ভিটে মাটি ছাড়া কোন জমিজমা নেই তাদের অন্যের সামান্য জমি বর্গা নিয়ে চাষ করে তার পিতা। ৪ বোন পিতা ও সৎ মাতাকে নিয়ে তাদের সংসার। ওরা ৪ বোনেই বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করে। ৪ বোনের মধ্যে সে মেঝ। সে অভাবের কারণে টুপি সেলাইয়ের কাজ করে বই খাতা কলম কিনে চালাত তার লেখাপড়া। পিতার প্রতিবন্ধি ভাতার টাকায় ৪ বোনের পড়া লেখার খরচ ও সংসার চলতো কোন রকমে। এখন দারিদ্র পিতার পক্ষে খাদিজাতুল কোবরার উচ্চ শিক্ষার খরচ দেয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সে ডাক্তার হতে চায় । কিন্তু দরিদ্র পিতার সংসারে এ পথ পাড়ি দেওয়া কি সম্ভব ?

জেমি আক্তার : দারিদ্রতা ও অর্থ সংকট দমিয়ে রাখতে পারেনি কাউনিয়া উপজেলার হরিশ্বর গ্রামের জেমি আক্তারকে। চরম অর্থ সংকটেও জেমি এবার এসএসসি পরীক্ষায় কাউনিয়া মোফাজ্জল হোসেন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে অংশ দিয়ে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছে। দরিদ্রতার সাথে লড়াই করে এসএসসি পাস করলেও উচ্চ শিক্ষা গ্রহন নিয়ে এখন দুঃচিন্তায় পড়েছে জেমি। মা রুজিনা জানায় বাড়ী ভিটা ছাড়া কোন জমি জিরাত নেই তাদের। ওরা ৩ বোন সবাই পড়ালেখা করে। অভাবের মাঝেও সব প্রতিবন্ধকতাকে পদদলিত করে ভালো কলেজে পড়ার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে জেমি। মেয়ের সাফল্যে খুশি হলেও মা নাছিমা তার ভবিষ্যৎ নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় রয়েছেন। জেমি চায় ডাক্তার হতে, কিন্তু দরিদ্র মাতার পক্ষে কিভাবে তা সম্ভব। তিনি মেয়ের জন্য সকলের কাছে দোয়া ও সহযোগিতা কামনা করেছেন।

আসিব হাসান : দরিদ্র শ্রমিক পিতার সন্তান প্রমাণ করেছে ইচ্ছা থাকলে সফলতা অর্জন করা সম্ভব। কাউনিয়ার টেপামধুপুর ইউনিয়নের বাজেমসকুর গ্রাম থেকে ৮ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে প্রতিদিন সাইকেলে করে পীরগাছা উপজেলার রংনাথ দাখিল মাদ্রাসায় যেত আসিব। ওই মাদ্রাসা থেকে থেকে মানবিক বিভাগ থেকে দাখিল পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে আসিব। বাজেমসকুর গ্রামের আনোয়ার হোসেনও মাতা আয়েশা বেগমের পুত্র সে। ৭ শতাংশ জমিতে নিজস্ব বসতভিটা ছাড়া আর কিছু নেই তাদের। আসিব জানায় ছোট দোকান করে তাদের সংসার চলে না, তার উপর ২ বোনের পড়ালেখার খরচ যোগান দেয়া পিতার পক্ষে অসম্ভব। তাই অভাবেব সংসারে অর্থ জোগান ও পড়ালেখার খরচ জোগাতে সে প্রাইভেট পড়িয়ে এ পর্যন্ত এসেছে। মা আয়েশা জানায়, তার ছেলের স্বপ্ন বিসিএস করে বড় কর্মকর্তা হওয়ার। কিন্তু ছোট দোকানদার পিতার পক্ষে ছেলের স্বপ্ন পুরুণ করা সম্ভব কি?

জাহাঙ্গীর আলম : পেটে ভাত জোটে না, পরনে চাহিদা মতো কাপড় থাকেনা। দরিদ্রতা আর নানা প্রতিকুলতার সাথে যুদ্ধ করে পীরগাছা উপজেলার রংনাথ দাখিল মাদ্ররাসা থেকে দাখির পরীক্ষায় মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে জাহাঙ্গীর আলম । সে কাউনিয়া উপজেলার বাজেমসকুর গ্রামের দিনমজুর নজরুল ইসলাম ও গৃহিনী মোছাঃ খাদিজা বেগমের পুত্র সে। ওরা ২ভাই । ৫শতক বাড়ি ভিটা ছারা আর কিছু নেই। বাবার দিনমজুরীর আয়ে চলে সংসার, আর ২ ভাইয়ের পড়া লেখা । বিভিন্ন বাড়িতে প্রাইভেট পড়িয়ে এতোদিন তার পড়ার খরচ জুগিয়েছে সে। মা খাদিজা ছেলের ফলাফলে খুশি হলেও তার চোখ দিয়ে অঝড়ে পানি ঝড়ে। ছেলের অনেক স্বপ্ন লেখাপড়া শিখে বড় হবে। কিন্তু সেই স্বপ্নের অর্থের যোগান হবে কি ভাবে ।তার স্বপ্ন পূরণে এখন বড় বাঁধা দারিদ্রতা। এ বাঁধা ডিঙ্গিয়ে সেই স্বপ্ন পূরন হবে কিনা সে চিন্তাই এখন সারাক্ষন জাহাঙ্গীরের। সে বিসিএস কর্মকর্তা হতে চায় সমাজের বৃত্তবানরাই পারে তার স্বপ্ন পুরণ করতে।

আমিন/১৯মে/২০১৯

Comments are closed.