rockland bd

এবার টার্গেট ইরান?

0

পারস্য উপসাগরে মার্কিন রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন সাথে শিগগিরিই যোগ দিবে অপর যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস আলিংটন। ইউএসএস আলিংটন উভচর যান ও যুদ্ধবিমান পরিবহনে সক্ষম। অপর রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনায় সজ্জিত। সাথে আরও খবর হলো, এরই মধ্যে কাতারে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে বেশ কয়েকটি বি-৫২ বোমারু বিমান মোতায়ন করা হয়েছে। এসব কিসের আলামত? তাহলে কী মধ্যপ্রাচ্যে আরও একটা ভয়ংকর যুদ্ধ আসন্ন?

এর সম্ভাব্য উত্তর হলো, হতেও পারে আবার নাও হতে পারে। একটা যুদ্ধ শুরু হবার ঠিক আগে আমরা যা দেখি তাহলো, উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়, মিথ্যাচার, সমর প্রস্তুতি আর ভিতর ভিতর কলকাঠি নাড়ে একদল।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এখন চলছে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়। এই বাক্য বিনিময়ের সূচনা ছয় জাতির পারমাণবিক চুক্তি থেকে ইরানের আংশিক বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে। যা প্রায় দুই বছর আলোচনার পর ২০১৫ সালের ১৪ জুলাই অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ সদস্য দেশ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স,রাশিয়া,চীন ও জার্মানির সঙ্গে ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়। এখন ইরান বলছে, চুক্তি থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে না গেলেও চুক্তির কিছু শর্ত আর এখন তারা মানবে না। ছয় জাতির সঙ্গে ইরানের সাক্ষরিত পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে এই অচলাবস্থার সৃষ্টি হয় ২০১৮ সালের ৮ মে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করার ঘোষণার মধ্য দিয়ে। চুক্তির প্রধান শর্ত ছিল ইরান তার দেশের ইউরেনিয়ামের মজুত দুই-তৃতীয়াংশ কমিয়ে আনবে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলছেন, ইরানের সঙ্গে সশস্ত্র সংঘাতের বিষয়টি তিনি উড়িয়ে দিতে পারছেন না। আর ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরান ইউরেনিয়ামের মজুদ বাড়াবে এবং একই সঙ্গে ইউরেনিয়াম বিক্রিও করবে। ইরানের জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় নেতা ইউসুফ তাবাতাবেই-নেজার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নৌযান ইরানের কেবল একটি ক্ষেপণাস্ত্রেই ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
মিথ্যাচারের বিষয়টি যদি লক্ষ্য করেন তাহলে দেখবেন- পেন্টাগনের দাবি, মার্কিন বাহিনী ও তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান চালাতে ইরানের প্রস্তুতির পরিপ্রেক্ষিতেই এই পদক্ষেপ। ইরান প্রতিবেশী ইরাকে অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করেছে, যা সেখানে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন যুদ্ধজাহাজ ও বোমারু বিমান মোতায়ন নিয়ে যা বলেছেন তাহলো, ইরানের কাছে খুবই স্পষ্ট ও নির্ভুল বার্তা দিতেই এই ব্যবস্থা। এর মধ্যেই পারস্য উপসাগরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপকূলে সৌদি আরবের দু’টি তেলবাহী ট্যাংকারসহ চারটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনায় ইরানকে একপাক্ষিকভাবে দোষারোপ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। যেটাকে আপনি ব্লেম গেমের অংশ হিসেবে ধরে নিতে পারেন।
সমর প্রস্তুতি ও বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের কমান্ডার মেজর জেনারেল হোসেন সালামি ইরানের পার্লামেন্ট অধিবেশনে তার দেওয়া বক্তব্যে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে মনস্তাতিক যুদ্ধ শুরু করেছে। পেন্টগনের ভাষ্য হলো, মার্কিন সৈনদের বিরুদ্ধে হুমকি মোকাবেলায় তারা প্রস্তুতি নিচ্ছে। এখন মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, এক্ষেত্রে ইরানের কী কোন ভূমিকা আছে? না যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরানের বিরুদ্ধে একতরফাভাবে যুদ্ধ চাপিয়ে দিতে চাচ্ছে। উত্তর হলো, সম্প্রতি ইরানি পার্লামেন্টে পাশ হওয়া একটি আইন যুক্তরাষ্ট্রকে ভাবিয়ে তুলেছে। আইনটিতে সব মার্কিন সৈনদের মধ্যপ্রাচ্যে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এখন দেখা যাক সম্ভাব্য ইরানের ওপর সামরিক হামলা নিয়ে ভিতর ভিতর কারা কলকাঠি নাড়ছে। মার্কিন সংবাদপত্র ওয়াশিংটন পোষ্টের এক প্রতিবেদন মতে, হোয়াইট হাউসের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন গত বছরই ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছিলেন। এ বছরের ফেব্র“য়ারিতে ইরানে ইসলামিক বিপ্লবের ৪০তম বার্ষিকী উপলক্ষে এক ভিডিও বার্তায় তিনি ইরানের নেতাদের উদ্দেশে বলেন, অভিনন্দন। খুব বেশি দিন আর বিপ্লবের বার্ষিকী উদযাপন করতে হবে না আপনাদের। পত্রিকাটির মতে, ইরানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা, দেশটির রেভল্যুশনারি গার্ডকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করা ও ইরানের সাথে পারমাণবিক চুক্তি বাতিলের পেছনে বোল্টনের হাত রয়েছে।
এতো গেল একজন ব্যক্তি। আসলে এক্ষেত্রে বড় নিয়ামক যে শক্তিটি পর্দার আড়াল থেকে কলকাঠি নাড়াচ্ছে সে হলো ইসরায়েল। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল তার নিরাপত্তা নির্বঘœ ও অক্ষুন্ন রাখতে চায়। এক্ষেত্রে ইরান হলো তার সবচেয়ে শক্ত বাধা। ধারণা করা হয়-মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল হলো একমাত্র পারমাণবিক শক্তি সমৃদ্ধ দেশ। আর সে চায় না এ অঞ্চলের অন্য কোন দেশ পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন করুক। এ জন্য তারা সম্ভাব্য সবকিছু তার মিত্রদের নিয়ে করতে সবসময় প্রস্তুত ও বিগত দিনেও সফলভাবে করে এসেছে।
এর আগে, ২২ সেপ্টেম্বর১৯৮০-২০আগস্ট ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত চলা ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময় ১৯৮০ সালের ৩০ সেপ্টম্বর ইরানের বিমানবাহিনীর দু’টি ফ্যান্টম-৪ যুদ্ধবিমান ইরাকের ওসিরাক পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায় ও এর আংশিক ক্ষতিসাধন করে। ফ্রান্স দ্রুত ইরাকের চুল্লী মেরামত করে দিলে ইরানের আক্রমণের লক্ষ্য ব্যাহত হয়। তবে কিছুদিনের মাঝেই চুল্লীটি ইসরায়েলের চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়। ২০০২ সালে ইসরায়েল আবারো ওসিরাকে বিমান হামলা চালায়। একথা আমরা এখন সকলে জানি ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময় ইসরায়েল অস্ত্র দিয়ে ইরানকে সহযোগিতা করেছিল।
আবার, ২০১১ সালের ২৬ জানুয়ারি সিরিয়ায় শুরু হওয়া গণ বিক্ষোভ প্রদর্শন যা অভ্যুথানে রুপ নিয়ে গৃহযুদ্ধ হিসেবে চলমান আছে। এই গৃহযুদ্ধের মধ্যে ২০০৭ সালের সেপ্টম্বর মাসে সিরিয়ার একটি স্থাপনায় হামলা চালায় ইসরায়েল। ইঙ্গ-মার্কিন বিশ্লেষকদের মতে, সিরিয়ার ঐ স্থাপনায় ইরানের সহযোগিতায় পারমাণবিক কর্মসূচি শুরু করা হয়েছিল।
সিরিয়ার ঘটনা লক্ষ্য করলে আমরা দেখব, সিরিয়ায় বিক্ষোভকারীদের দবি ছিল রাষ্ট্রপতি বাশার আল-আসাদের পদত্যাগ, তার সরকারের ক্ষমতাচ্যুতি ও সিরিয়ায় দীর্ঘ ৫ দশকের আরব সোশ্যালিস্ট বাথ পার্টির শাসনের পতন। যার কোনটিই এই যুদ্ধে অর্জন করা সম্ভব হয় নি। কিন্তু ইসরায়েল ঠিকই সিরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করে দিতে সক্ষম হয়েছে। এ অঞ্চলে এখন আর শুধু ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করা বাকি আছে ইসরায়েলের। এর আগে বহুবার তারা একক প্রচেষ্টায় তা ধ্বংস করার হুঁমকি দিয়েছে ও চেষ্টা করেছে কিন্তু সফল হয়নি।
ইরানের ঘোষিত পারমাণবিক স্থাপনা পাঁচটি। এগুলো হলো, নাতাগঞ্জ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্ল্যান্ট, ফর্দো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্ল্যান্ট,আরাক ওয়াটার প্ল্যান্ট, ইস্ফাহান ইউরেনিয়াম মজুদকরণ প্ল্যান্ট, এবং পারচিন সামরিক স্থাপনা। এদের ভেতর প্রথমটি ভূ-অভ্যন্তরে ও দ্বিতীয়টি পার্বত্য এলাকার অনেক গভীরে সুরক্ষিত স্থাপনা। তাই বলা যায়, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করা খুব সহজ হবে না। সাথে ইরানের সবচেয়ে বড় অংশিদার চীন হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। যুক্তরাষ্ট্র চীনের সাথে ইতোমধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধ বাধিয়েছে। আর অপর পরাশক্তি রাশিয়াও যে জোরালো ভূমিকা রাখবে একথা জোর দিয়ে বলা যায়। এরই মধ্যে সিরিয়ার তারতুস বন্দরে স্থায়ী নৌ-ঘাঁটি নির্মাণ ও লাতাকিয়া শহরে একটি বিমান ঘাঁটি বানাচ্ছে রাশিয়া। দেশটি মধ্যপ্রাচ্যে তার শক্ত অবস্থান পাকাপোক্ত করতে সবকিছু করে যাচ্ছে।
জটিল সব সমীকরণের মধ্যে সম্ভাব্য ইরান সংকট নিয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মন্ত্রিসভার সদস্য স্টেইনিতজ সম্প্রতি বলেছেন, ইরানের সঙ্গে তার প্রতিবেশী দেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত শুরু হলে ইরান যে হিজবুল্লাহ ও গাজায় ইসলামিক জিহাদকে সক্রিয় করবে না, তা আমি উড়িয়ে দিতে পারছি না। সিরিয়ায় চলমান গৃহযুদ্ধের মধ্যে ইসরায়েল ও ইরান অবশ্য প্রক্সি যুদ্ধ সেরে নিয়েছে।
সিরিয়ায় ইরানের অবস্থানের ওপর ইসরায়েল অনেক বার হামলা করেছে। তারপরও সিরিয়ায় ইরানের শক্ত অবস্থান ইসরায়েলকে ভাবিয়ে তুলেছে। ইরান ও রাশিয়া মূলত বাশার আল-আসাদকে সিরিয়ার রাষ্ট্রক্ষমতায় টিকিয়ে রেখেছে। যা ইসরায়েল ও তার মিত্রদের একটা বড় পরাজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইরান নিয়ে ইসরায়েলের আরও একটি মাথাব্যথার কারন হলো ফিলিস্তিনের হেজবুল্লাহ ও হামাসের উপর ইরানের প্রভাব বৃদ্ধি। যা তারা ইরানের শক্তি নিশ্বেস করার মধ্য দিয়ে অবসান করতে চায়।
সম্ভাব্য ইরান সংকট নিয়ে আর প্রধান যে কারণটির কথা ভাবা হচ্ছে, তাহলো ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। এর আগে ২০০৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগের বছর সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ইরাক আক্রমণ করে নিজের পক্ষে জনমত টানতে চেয়েছিলেন ও সফলও হয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে উল্লেখ করার মতো কোন কিছুই অর্জন করতে পারেননি। তিনি উত্তর কোরিয়ার সাথে পারমাণবিক অস্ত্র নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি করতে ব্যর্থ হয়েছেন। চীনের সাথে বাণিজ্য যুদ্ধ বাধিয়ে নিজ দেশে সমালোচনার মুখে আছেন। তার সামনে এখন শুধু ইরানে হামলা করার মাধ্যমে নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রের বলিষ্ঠ প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রমাণ করার মোক্ষম সুযোগ রয়েছে।
ধারণা করা যায়, তিনি তা করতে পারেন। এটা করলে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কট্টোর ভোটার, ইহুদি লবি ও বন্ধু রাষ্ট্র ইসরায়েলকে খুশি করতে পারবেন। আর আমরা কে না জানি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ইহুদি লবির ক্ষমতা ও ভূমিকা কত ব্যাপক। বলা হয়ে থাকে-যুক্তরাষ্ট্রে ইহুদি লবি না চায়লে কেউই মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারেন না। আর এবার নির্বচনের আগের বছর ইরানের উপর হামলা করে দ্বিতীয় মেয়াদের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বচনি ট্রাম্প কার্ড হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন।
লেখক : মোহাঃ হারুন-উর-রশিদ

আমিন/১৪মে/২০১৯

Comments are closed.