rockland bd

খাগড়াছড়ির সিংহভাগ ফসলি জমি তামাক চাষের দখলে

0

সোহাগ মজুমদার, খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি
পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ির বিস্তীর্ণ ফসলি জমি দখল করে নিচ্ছে বিষাক্ত তামাক। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোল ঘেঁষে জনবসতিপূর্ণ এলাকায় চাষ হচ্ছে তামাকের। এতে একদিকে যেমন স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ছে তেমনি তামাক চুল্লিতে জ্বালানী হিসেবে বনের কাঠ ব্যবহার করার উজাড় হচ্ছে বনাঞ্চল। বেশী মুনাফার প্রলোভনে স্থানীয় কৃষকদের তামাক চাষে উদ্বুদ্ধ করছে টোব্যাকো কোম্পানীগুলো। যদিও কৃষি বিভাগ বলছে ধীরে ধীরে এ জেলায় তামাকের চাষ কমছে, তবে বাস্তবের চিত্র ভিন্ন।

পার্বত্য জেলাগুলোর আবহাওয়া ও মাটি তামাক চাষের জন্য বেশ উপযোগী। অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে পাহাড়ি জনপদে তামাকের ফলন বেশি আর মানেও হয় উন্নত। তাই পার্বত্যাঞ্চলের নদীর চরাঞ্চলের ফসলি জমি ও বিদ্যালয় ঘেঁষে এমনকি বাড়ির আঙ্গিনায়ও তামাক চাষ করা হচ্ছে। খাগড়াছড়ি জেলা সদর ও দীঘিনালা, মাটিরাঙ্গা, উপজেলাসহ বেশ কয়েকটি উপজেলায় বিস্তৃত হচ্ছে তামাক চাষ। ফসলি জমিগুলো দখলে নিচ্ছে তামাকের আগ্রাসন। স্থানীয় কৃষকদের তামাক চাষের জন্য অগ্রিম টাকা, সার ও কীটনাশকসহ সব ধরনের সহযোগীতা দিচ্ছে টোব্যাকো কোম্পানীগুলো। সেই সাথে বেশী মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে চাষীদের উদ্বুদ্ধ করছে তামাক চাষে। আর বেশী লাভের আশায় স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়েও তামাক চাষে নেমেছেন কৃষকরা। এতে প্রাকৃতিক পরিবেশ যেমন হুমকিতে পড়েছে, তেমনি দিনে দিনে কমে আসছে ফসলি জমি।

এছাড়া দীঘিনালা, মাটিরাঙ্গাসহ সকল উপজেলায় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোল ঘেঁষে চাষ হচ্ছে তামাকের। ফলে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের রোগ-বালাই বেড়েই চলেছে বলে জানায় শিক্ষার্থীর অভিভাবকরা।

মেরুং ইউপি চেয়ারম্যান হুমায়ন কবির রতন বলেন, এই এলাকার অধিকাংশ পাহাড়ি-বাঙালি দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করছে। আয়ের বিকল্প কোন পথ না পেয়ে অনেকেই ক্ষতিকর জেনেও স্বাস্থ্যহানীর সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখে বাধ্য হয়েই তামাক চাষে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। আবার কেউ কেউ তামাক চাষের ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে মোটেও অবগত নন। তিনি আরও জানান, ব্রিটিশরা আমাদেরকে যেভাবে শাসন করে গিয়েছিলো ঠিক ধারাবাহিকতায় ভিন্ন পন্থায় টোব্যাকো কোম্পানীগুলো এই এলাকার সাধারণ মানুষদের শোষণ করে যাচ্ছে। এছাড়াও নিয়মিত মাসোয়ারা নিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালী একটি চক্র টোব্যাকো কোম্পনীগুলোকে সহযোগীতা করায় রোধ করা যাচ্ছে না তামাকের চাষ।

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ সফর উদ্দিন জানান, চলতি বছর ৫৯৭ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হচ্ছে। সরকারী পর্যায়ে তামাকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে কোন ধরনের প্রচারাভিযান নেই। তবে উপজেলা কৃষি অফিসের মাধ্যমে কৃষকদেরকে তামাক চাষের ফলে মাটির দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি ও ফসল উৎপাদন ব্যহত হওয়া প্রসঙ্গে ধারণা দেয়া হয় বলেও জানিয়েছেন। ধারণা দেওয়া হয় যে, তামাক চাষে মাটি দীর্ঘস্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং একপর্যায়ে ফসল উৎপাদন ব্যহত হয়।

বিশেষজ্ঞরা জানান, কোন জমিতে একবার তামাক চাষ করা হলে সে জমিতে অন্য ফসল ফলানো যায় কষ্টসাধ্য। আর এভাবে তামাক চাষ অব্যাহত থাকলে সহসাই খাগড়াছড়িতে স্বাস্থ্য ও খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে বলে অভিমত অনেকের।

এদিকে সরকারী পরিসংখ্যানের ভিন্ন চিত্র খাগড়াছড়িতে, ধারণা করা হচ্ছে পরিসংখ্যানের প্রায় চারগুন বেশি জমিতে চাষ হচ্ছে তামাকের। এছাড়া তামাক চাষ বিস্তৃত হওয়ায় তামাক চুল্লির সংখ্যাও বাড়ছে। চুল্লিগুলোতে ব্যাপকহারে পোঁড়ানো হচ্ছে বনের কাঠ। নির্বিচারে কাঠ পোঁড়ানোর ফলে উজাড় হচ্ছে বনাঞ্চল। তবে সব দেখেও নির্বিকার প্রশাসন।

খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক মো.শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আইনে তামাক চাষকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। এটি একেবারে নিষিদ্ধ করা হয়নি। তামাক চাষ বে-আইনি নয়। কেউ যদি স্ব-প্রণোদিত হয়ে তামাক চাষ করেন সেক্ষেত্রে নিষেধ করা যাবে না। টোব্যাকো কোম্পানীগুলো কৃষকদের সাথে সমঝোতা করে, বিভিন্ন প্রণোদনা দিয়ে তাদের উদ্বুদ্ধ করছে। কৃষরাও অন্যান্য ফসলের তুলনায় বেশী লাভজনক হওয়ায় তামাক চাষে ঝুঁকে পড়েছে।’

তবে এটি স্বাস্থ্য ও ফসলি জমির জন্য ক্ষতিকর বলে স্বীকার করে জেলা প্রশাসক আরও জানান, চাষীদের সচেতন করার ব্যাপারে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সবরকমের চেষ্টা অব্যাহত আছে। এছাড়া চুল্লিতে বনের কাঠ পোঁড়ানোর ব্যাপারে সংবাদ পেলেই ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
রাকিব/বাংলাটুডে

Comments are closed.