rockland bd

ভারতের জাতীয় নির্বাচন: কে হতে পারেন নতুন প্রধানমন্ত্রী?

0


মোহাম্মদ আলী সরকার (বাংলাটুডে) :
আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে পার্লামেন্ট নির্বাচন শুরু হয়ে গেছে গত ১১ই এপ্রিল তারিখ থেকে। নানা কারণে এই নির্বাচন আমাদের দেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য বাংলাদেশীরাও জানতে আগ্রহী কে হতে যাচ্ছেন সে দেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী।
ভারত আকার আয়তনে বাংলাদশের চেয়ে অনেক, অনেক বড় এবং জনসংখ্যার দিক দিয়েও দেশটি বিশ্বে দ্বিতীয় প্রধান দেশ। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ হিসাবেও পরিচিত। দেশের ২৯টি প্রদেশ ও ৭টি কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলবে এই ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়া। শেষ হবে ১৯ শে মে আর ফলাফল ঘোষিত হবে এর ৪ দিন পর অর্থাৎ ২৩ শে মে তারিখে। দেশটিতে বর্তমান তালিকাভুক্ত ভোটারের সংখ্যা ৯০ কোটি! এই বিশাল সংখ্যক ভোটদাতার ভোটগ্রহণের বিষয়টি চাট্টিখানি কথা নয়। এ কারণে একগুচ্ছ করে রাজ্যে একদিন করে ভোট নিয়ে গোটা প্রক্রিয়া শেষ করতে কয়েক সপ্তাহ সময় লেগে যাবে। অতীতেও তাই হয়েছে, এবারও তাই হবে। আর এই বিশাল ভোট যজ্ঞে লক্ষাধিক নির্বাচন কর্মকর্তা ও কর্মাচারী নিয়োজিত থাকবেন।
ভারতীয় পার্লামেন্টের এই নিন্মকক্ষ বা লোকসভা নির্বাচন হবে ৫৪৩ আসনে। এটি ভারতের ১৭ তম জাতীয় নির্বাচন। ভারতে বর্তমানে জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায় মিলিয়ে নিবন্ধিত মোট রাজনৈতিক দল রয়েছে দুই হাজারেরও বেশী। তবে এর সিংহভাগ দলই এই নির্বাচনে কোন প্রার্থী মনোনয়ন দেয় নাই। ফলে মূলত ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি এবং রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী কংগ্রেস পার্টির মধ্যেই নির্বাচনী লড়াই সীমাবদ্ধ থাকবে। তবে জনসংখ্যার দিক দিয়ে দেশের সবচেয়ে বড় রাজ্য উত্তর প্রদেশে মায়াবতীর এবং অখিলেশ যাদবের দুটি আঞ্চলিক দল এবং পশ্চিম বঙ্গে তৃণমূল কংগেসের মত কিছু আঞ্চলিক দল ভারতের নানা অঞ্চলে বেশ প্রভাবশালী এবং বিজেপি ও কংগ্রেস সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে তাদের জন্য সরকার গঠনে এই সব আঞ্চলিক দলের সমর্থন অপরিহার্য হয়ে পড়বে। যে দল কমপক্ষে ২৭৩টি আসন পাবে সেই দলই সরকার গঠন করবে-না হলে আঞ্চলিক দলের সমর্থন দরকার হবে।
এবারের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিজেপি জিতলে মোদি হবেন দ্বিতীয় বারের মত প্রধানমন্ত্রী। অন্যদিকে কংগ্রেস জিতলে ঐতিহাসিক গান্ধী পরিবারের সন্তান রাহুল গান্ধী হবেন ভারতের নয়া প্রধানমন্ত্রী। কার পালা ভারী এই নির্বাচনে সেটা একটি বিচার করে দেখা যাক।
একশ কোটি মানুষের এই দেশে সমস্যার কমতি নেই। দারিদ্র, কৃষকদের ক্রমবর্দ্ধমান অসন্তুষ্টি, বেকারত্ব, ক্রমবর্দ্ধমান ধর্মীয় অসহিষ্ণুতায় উদ্বিগ্ন দেশবাসীকে বিজেপি ও কংগ্রেস উভয় দল যে সব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তার উপর দেশবাসীর আস্থার উপর নির্ভর করবে এবারের নির্বাচনের ফলাফল। তাই উভয় প্রধান দলই নির্বাচনী টার্গেট করেছে দেশের বিশাল দরিদ্র জনগোষ্ঠিকে।
মোদির বিজেপির নির্বাচনী ইশতেহারে কৃষি, বাণিজ্য, অর্থনীতি, শিক্ষা, সুশাসন, স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নসহ নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে এবং বিজেপি তাদের এই ঘোষণাকে নির্বাচনী ইশতেহার না বলে একে অভিহিত করেছে “অঙ্গীকার” হিসাবে। একগুচ্ছ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিও তারা ঘোষণা করেছে।
অন্যদিকে রাহুল গান্ধীর কংগ্রেস পার্টিও মোদি সরকারকে হঠিয়ে ক্ষমতায় আসার মানসে দেশবাসীর জন্য ঘোষণা করেছে তাদের নানা প্রতিশ্রুতি। কৃষক সমাজের অসন্তুষ্টিকে তারা প্রাধান্য দিয়েছে সবার উপরে। রাহুল ঘোষণা দিয়েছেন তার দল ক্ষমতায় গেলে দরিদ্রতম কৃষক পরিবারের জন্য মাসিক ৬ হাজার করে রুপি সহায়তা দেবেন। তিনি তার দলের এই ভবিষ্যত কর্মসূচিকে দারিদ্র্যের প্রতি শেষ কষাঘাত হিসাবে বর্ণনা করেছেন। বর্তমান ভারতে যে ২২ লাখ সরকারি পদ খালি আছে তা পূরণের প্রতিশ্রুতিও তিনি দিয়েছেন। দিয়েছেন স্বাস্থ্য খাত ও অন্যান্য নানা খাতে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি।
নরেন্দ্র মোদির শাসনোমলে উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদ মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। সংখ্যালঘু মুসলমানদের উপর ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার ছোবল পড়ে অনেক স্থানে। তার দলের সদস্যরা বা তাদের মদদপুষ্টরা গো মাংস খাওয়া বা রাখার সন্দেহে বেশ কিছু মুসলমানকে নির্মমভাবে পিটিয়ে মেরেছে। মূলত মোদি সরকারের সমর্থনেই প্রধানত উত্তর প্রদেশ রাজ্যে বহু ঐতিহ্যবাসী স্থানের মুসলিম নাম পাল্টিয়ে হিন্দু নাম দেওয়া হয়েছে। এ কারণে সারা ভারতের মুসলমান ভোটারেদর একটা বিরাট অংশ বিজেপির প্রতি যে মুখ ফিরিয়ে নেবেন সেটা অনুমান করা যায়।
মোদি সরকার এর আগে এক ঘোষণায় বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানসহ যে সব প্রতিবেশী দেশে, তাদের ভাষায়, “যে সব হিন্দু এখনও ঐ সব দেশে রয়ে গেছেন” তারা ভারতে এলে স্বাগত জানানো হবে এবং তাদের ভারতীয় নাগরিকত্ব দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন। এই ঘোষণার কারণে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের বাঙ্গালী হিন্দু ভোটারদের ভোট মোদির পক্ষে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশী। তবে আসাম রাজ্যে, যেখানে চলছে বাংলাভাসী মুসলমান বিতাড়ন আন্দোলন, সেখানে মুসলিম ভোটাররা নিশ্চিতই বিজেপির বিপক্ষে ভোট দেবেন বলে ধরে নেওয়া যায়।
মোদির বিজেপি কাশ্মীরের পুলাওয়ামায় গেরিলাদের হাতে ৪০ জন ভারতীয় আধা সামরিক বাহিনীর লোক নিহত হওয়ার পর ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। পাকিস্তানে বিমান হামলা চালানোর পর দেশবাসীর কাছে তার ভাবমূর্তি বেড়েছে। ভোটে তারও একটা প্রভাব নিশ্চয়ই পড়বে। দেশে বর্তমানে প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ৭ শতাংশ। দারিদ্র্যও বেশ কমেছে। বিজেপি প্রচার করছে তাদের অর্থনীতি যে ভাবে বাড়ছে তাতে কয়েক বছরের মধ্যে তা চীনকে ছাড়িয়ে যাবে। কিন্ত ভারতে বেকারত্ব কমেনি। বরং ভোটের আগে গোপনে পাচার হওয়া এক রিপোর্টে দেখা গেছে যে ১৯৭০ সালের পর বেকার লোকের সংখ্য বেড়েছে সবচেয়ে বেশী।
দেশবাসীর কাছে নরেন্দ্র মোদির ভাবমূর্তি একজন দরিদ্র মানুষের। দরিদ্র ভারতের কোটি কোটি মানুষ তার সাথে নিজের জীবনের মিল খুঁজে পান। তিনি রেল স্টেশনের চা বিক্রেতা থেকে উঠে আসা একজন দরিদ্র সংগ্রামী মানুষের প্রতিচ্ছবি। অন্যদিকে গান্ধী পরিবারের সদস্য এবং একজন বিদেশী মায়ের সন্তান রাহুল গান্ধী ঐতিহ্যবাহী কংগ্রেস দলের বর্তমান প্রেসিডেন্ট। তিনি উচ্চবিত্তের প্রতিচ্ছবি। তিনি রাজনীতিতেও তেমন পরীক্ষিত নন। এই ইমেজ বা ব্যক্তি ভাবমূর্তির দিক থেকে বিচার করলে মোদির পাল্লা ভারী বলে মনে হওয়া স্বাভাবিক।

এবিএস

Comments are closed.