rockland bd

পেঁয়াজের বীজ আবাদ করে স্বাবলম্বী কৃষক বক্তার খান

0

কে এম রুবেল, ফরিদপুর প্রতিনিধি (বাংলাটুডে) :

ফরিদপুর জেলার মাটি ও আবহাওয়া পেঁয়াজ বীজ চাষের উপযোগী হওয়ায় দিন দিন বাড়ছে এ অঞ্চলে পেঁয়াজ বীজের আবাদ।

জেলার প্রায় প্রতিটি মাঠজুড়ে এখন পেঁয়াজ বীজের সাদা ফুলের মনমুগ্ধকর দৃশ্য চোখে পড়ে। দুচোখের দৃষ্টিসীমা যতদুর যায়, শুধু সাদা ফুলের সমারোহ। আর মাত্র কয়েক সম্পাহ পর এই ফুল থেকে পাওয়া যাবে কাল সোনা খ্যাত পেঁয়াজ বীজ।
দেশের সর্ববৃহৎ পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনে শীর্ষে রয়েছে ফরিদপুর জেলা। কৃষি বিভাগ বলছেন চলতি বছর প্রায় ২০০ কোটি টাকার পেঁয়াজ বীজ উৎপন্ন হবে ফরিদপুর জেলায়।
ফরিদপুর সদর উপজেলার অম্বিকাপুর ইউনিয়নের কৃষক বক্তার হোসেন খান গত ১৫বছর ধরে নিজ উদ্যোগে পেঁয়াজ বীজের আবাদ শুরু করেন। শুরু থেকেই সাফল্য পেয়ে আসছে এই কৃষক। ফলে দিন দিন বীজ আবাদের পরিমান বাড়িয়েছেন এবং বীজ বিক্রি করে স্বাবলম্বীও হয়েছেন।
অন্যদেরও কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে বক্তার হোসেনের বীজের খামারে। তার সাফল্য দেখে অনেক শিক্ষিত বেকার যুবকও পেঁয়াজ বীজ আবাদ করে সাভলম্বী হয়েছে। তার পেঁয়াজ বীজের মাঠে কাজ করে এলাকার অনেক বেকার যুবক ও কৃষকের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে। প্রতিদিন পেঁয়াজ বীজের মাঠে ৩০/৪০জন কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন।
কৃষক বক্তার হোসেন জানায়, প্রথম জীবনে পেঁয়াজ চাষের জন্য অন্য অঞ্চল থেকে পেঁয়াজের বীজ কিনে প্রতারিত হন তিনি। বীজ কিনে প্রতারিত হয়ে নিজেই শুরু করেন বীজের চাষ। শুরু করেন মানসম্মত বীজ উৎপাদন। প্রথমে ৫০ শতাংশ দিয়ে শুরু করেছিলেন। বীজ উৎপাদনে অভাবনীয় সাফল্য পান তিনি। আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। ৫০ শতাংশ থেকে এখন তিনি চাষ করছেন ২৫একর জমিতে। উৎকৃষ্ট মানের ও মানম্মত বীজ উৎপাদন করায় সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে বক্তার হোসেনের বীজের শুনাম।
কৃষক বক্তার খানের সাফল্য দেখে ফরিদপুর অঞ্চলের চাষিরা অন্য ফসল চাষ বাদ দিয়ে শুরু করেছেন পেঁয়াজ বীজের আবাদ। বক্তার খানের পাশা পাশি অন্য কৃষকেরাও ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটেছে। অনেক শিক্ষিত বেকার যুবকরাও পেঁয়াজ বীজ আবাদ করে সাফল্য পেয়েছেন। দেশের বিভিন্ন জেলার কৃষকেরা বক্তার খানের বীজের মাঠ পরিদর্শন করেন ও পরামর্শ গ্রহণ করেন।
বক্তার হোসেন বলেন, পেঁয়াজের বীজ যেমনি লাভ জনক, তেমনি ঝুকিপূর্ণ ফসল। এক একর জমিতে বীজ আবাদ করতে সবমিলিয়ে খরচ হয় এক লাখ বিশ হাজার টাকা। আবহাওয়া অনুকুলে থাকলে এক একর জমির উৎপাদিত বীজ প্রায় আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রয় করা সম্ভব। বক্তার হোসেনের উৎপাদিত বীজ স্থানীয় চাহিদা পুরন করে এখন দেশের বিভিন্ন জেলার চাহিদা পুরণ করছে। কুষ্টিয়া, পাবনা, মানিকগঞ্জ, কালুখালী, পাংশা বাজবাড়ী, ময়মনসিংহ, সেরপুর, রাজশাহী, ঝিনেইদাহসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের চাষিদের চাহিদা পুরণ করছে।
কৃষক বক্তার হোসেন বলেন, আমি বিএডিসি’র চুক্তি বদ্ধ চাষি এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এর এস এম ই কৃষক। দীর্ঘদিন ধরে বীজ উৎপাদন করে আসছি। বীজ চাষ করে আমি স্বভলম্বী হয়েছি। আমার সাফল্য দেখে এখন এই অঞ্চলের অনেকেই বীজ চাষ করে সাফল্য পেয়েছে। চলতি বছর আমি তাহিরপুরী, ফরিদপুরী, বারী-১, লাল তীর কিং ও শুকসাগর জাতের বীজ চাষ করেছি। বর্তমানে আমার মাঠের অবস্থা খুবই ভাল। আশা করছি বাকি সময় আবহাওয়া ঠিক থাকলে বাম্পার ফলন হবে। বীজের ভাল মূল্যও পাব বলে আশা করছি।
কৃষক জামাল বিশ্বাস বলেন, আগে আমরা ধান, পাট, গম এর চাষ করে কোনরকম পরিবার পরিজন নিয়ে দিন কাটাতাম। বক্তার হোসেনের পেঁয়াজ বীজ চাষের সাপল্য দেখে আমিও কয়েক বছর ধরে বীজের চাষ করছি। বীজের চাষ করে অনেক লাভবান হয়েছি। শুধ আমিই না, আমাদের এই অঞ্চলের প্রায় দুইশত জন কৃষক এখন পেঁয়াজের বীজ চাষ করে লাভবান হয়েছে। তবে সরকারী সহযোগিতা পেলে আগামীতে আরও বেশী চাষ করতে পারব আমরা।
ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায় চলতি বছর ফরিদপুর জেলার নগরকান্দা, ভাঙ্গা, সালথা ও সদর উপজেলার অম্বিকাপুর ইউনিয়নে ১৮শ ৩০ হেক্টোর জমিতে পেঁয়াজ বীজের চাষ হয়েছে।
সদর উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মো. আবুল বাসার মিয়া বলেন, পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনে সারা দেশের মধ্যে শীর্ষে ফরিদপুর জেলা। আর ফরিদপুর জেলার মধ্যে শীর্ষে অবস্থান করছে আমাদের এস এম ই কৃষক বক্তার হোসেন খান। বক্তার হোসেনের উৎপাদিত বীজ এখন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। আমরা কৃষি বিভাগ থেকে তাকে সবধরণের সহযোগিতা করে থাকি।
ফরিদপুর বিএডিসি’র উপপরিচালক (ক: গ্রা:) মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, কৃষক বক্তার হোসেন আমাদের চুক্তিবদ্ধ চাষি। সে ভাল মানের বীজ উৎপাদন করায় আমরা তাকে প্রশিক্ষণসহ বীজ সংরক্ষনের বিষয়ে সবধরনের পরমর্শ দিয়ে থাকি। বিএডিসির পক্ষ থেকে সঠিক মূল্য দিয়ে বক্তার হোসেনের বীজ কিনে নিয়ে আমরা দেশের বিভিন্ন চাষীদের মাঝে বিতরণ করে থাকি। তিনি ফরিদপুর জেলা একজন সফল বীজ উৎপাদনকারী চাষি।
ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ কার্তিক চন্দ্র চক্রবর্তী বলেন, ফরিদপুর জেলায় এবছর প্রায় ১৮শ ৩০ হেক্টোর জমিতে (দানা পেঁয়াজ) পেঁয়াজ বীজের আবাদ হয়েছে। মৌসুমের শুরুতে আমরা কৃসি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে প্রদর্শনী কৃষকদেরকে আমরা বীজ দিয়েছি। বিশেষ করে বারী পেঁয়াজ-১ দিয়েছি। সার দিয়েছি, প্রশিক্ষণ দিয়েছি। রাজস্ব প্রকল্প থেকে ২৪০টা প্রদর্শনী স্থাপন করেছি। সারা দেশের চাহিদার ৭৫ভাগ বীজ চাহিদা ফরিদপুর থেকে মেটানো হয়। কৃষকের যেটি পছন্দ হবে, কৃষক যেটিতে লাভবান হবে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সেটি নিয়েই কাজ করবে। আমরা আশা করছি চলতি বছর প্রায় ১১ মেট্রিকটন বীজ উৎপাদন হবে, যার বাজার মূল্য প্রায় ২০০কোটি টাকা।

হাসান/বিটু

Comments are closed.