rockland bd

আর এমন মৃত্যুপুরী দেখতে চাই না

0


মো. গোলাম মোস্তফা :

দাউ দাউ করে লেলিহান আগুন জ্বলছে। নিঃশ্বাস নেবার বাতাসটুকু ফুরিয়ে আসছে। সাততলা ভবনটি যেনো মুত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। চকবাজারের এই ওয়াহিদ ম্যানশন ভবনটিতেই থাকতেন ডেন্টাল কলেজের শেষবর্ষে পড়ুয়া শিক্ষার্থী ইমতিয়াজ আহমেদ। তার বাড়ি পাবনায়। বাবা স্কুলের প্রধান শিক্ষক। শিক্ষক বাবার স্বপ্ন ছিলো ছেলে ডাক্তার হয়ে তাঁর স্বপ্ন পূরণ করবে। কিন্তু তাঁর সে স্বপ্ন আগুনেই শেষ হয়ে গেছে।
এবারের একুশে ফেব্রুয়ারি পুরো বাংলাদেশকে কাঁদিয়েছে। ঢাকার চকবাজারের ভয়াবহ অগ্নি দূর্ঘটনা একুশে ফেব্রুয়ারির শোককে যেনো আরো দীর্ঘায়িত করেছে। চকবাজারের ওই আগুনে পুড়ে যাওয়া ভবনটিতে থাকতেন একজন গর্ভবতী মা। পেটের শিশু- যে এখনো পৃথিবীর মুখ দেখেনি, সে মায়ের সাথে পেটের ভিতরে পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। মহিলাটির স্বামী গর্ভবতী স্ত্রীকে ফেলে রেখে যেতে চাননি। আহা কি ভালোবাসা ! স্ত্রীর সাথে নিজেও আগুনে পুড়ে কয়লা হয়ে গেলেন। কত স্বপ্ন, কত আশা ছিলো গর্ভের সন্তানকে নিয়ে। সেসব স্বপ্ন আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
পুরান ঢাকার চকবাজারের ওই অগ্নি দূর্ঘটনায় কমপক্ষে ৭৮ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে বিবিসিতে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। যদিও মৃতের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি আছে। তবুও এত মানুষের সাথে কত পরিবার জড়িত ছিলো, কত স্বপ্ন ছিলো ভাবা যায়! এই দূর্ঘটনা কিন্তু নতুন নয়। ২০১০ সালের ৩ জুনেও পুরান ঢাকার নিমতলীতে অগ্নিকাণ্ডে ১২৪জন মানুষ পুড়ে মারা গিয়েছিলো। প্রতি বছরই এরকম দূর্ঘটনা ঘটছে। বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত দশ বছরের ১৬ হাজার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। আর এতে ১ হাজার ৫৯০ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
আগুন নেভানোর জন্য ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের গাড়িও ঠিকমতো পৌছাতে পারেনি। গাড়ি পৌছাবে কি করে? ওই এলাকায় ঢোকার যে রাস্তা সেটি অত্যন্ত সংকীর্ণ এবং সরু। ফলে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের ঘটনাস্থল থেকে দূরে পাইপ সেটিং এর মাধ্যমে পানি এনে আগুন নেভাতে হয়েছে।
আমাদের দেশের একটি পরিচিত ঘটনা হলো- সরকারি রাস্তা ও বিভিন্ন জায়গা দখল করে প্রভাবশালীরা ভবন নির্মাণ করে। ফলে রাস্তার জন্য বরাদ্দকৃত জায়গা সংকুচিত হয়ে তা এমন রাস্তায় পরিণত হয়েছে যেখান দিয়ে কোনো নিরাপত্তা রক্ষার গাড়িই প্রবেশ করতে পারে না। চকবাজারের দূর্ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলেছেন যে, ওই এলাকার ভবন নির্মাণ আইন অনুযায়ী হয়নি। তাছাড়া ওরকম একটি জনবহুল এলাকায় গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারে অসচেতনতা, যত্রযত্র রাসায়নিকের মজুদ প্রভৃতি কারণেই এই অগ্নি দূর্ঘটনার সূত্রপাত। এর আগেও যতগুলো অগ্নিদূর্ঘটনা ঘটেছে সেগুনের এক্ষেত্রে এসব অসচেতনতার প্রমাণ মিলেছে। ফলে দুধের নিষ্পাপ শিশু, গর্ভবতী মা, বয়ষ্ক-বৃদ্ধ চোখের সামনে পুড়ে ছাই হয়ে গেলেও আমরা তেমন কিছুই করতে পারিনি। অসহায়ভাবে কেঁদে চলেছে পুড়ে মরা পরিবারগুলোর লোকেরা। কিন্তু এভাবে আর কত লাশের বোঝা বইতে হবে? এ প্রশ্নের উত্তর কি শুধু দীর্ঘশ্বাস? তাই আমার মনে হয়, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে আরো শক্তিশালী ভূমিকা নিতে হবে। অব্যবস্থাপনাকে প্রশ্রয় দেখা যাবে না। রাসায়নিকের যত্রতত্র মজুদ নিষিদ্ধ করতে হবে। এব্যাপারে জাতীয় রাসায়নিক সমন্বয় কমিটি গঠন করা যেতে পারে। অন্যদিকে সরকারি জায়গা দখলমুক্ত করতে হবে। ঢাকার জনবহুল এলাকাগুলোতে ফায়ার সার্ভিস ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর রাস্তাগুলোকে সেভাবে প্রশস্ত করতে হবে। যাতে দূর্ঘটনার মুহূর্তে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে অসুবিধা না হয়।
কথায় আছে, যার চলে যায় সেই বোঝে হায়, বিচ্ছেদে কি যন্ত্রণা! প্রিয়জন হারানোর বেদনা সত্যিই আকাশ বাতাসকে ভারী করে দেয়। চকবাজারের অগ্নিদূর্ঘটনায় যে মা তার ছেলেকে হারালো, সে কি আর কখনো ফিরে পাবে? এই প্রশ্ন আমাদের বিবেকবান প্রতিটি মানুষকে কাঁদায়। আমরা চাই আর কোনো মায়ের বুক যেনো খালি না হয়। আগুনের লেলিহান শিখা যেনো আমাদের সব স্বপ্নকে কেড়ে না নেয়। আমরা আর এমন মৃত্যুপুরী দেখতে চাই না।

লেখক : শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

Comments are closed.