rockland bd

ষোড়শ সংশোধনী অসাংবিধানিক ঘোষণার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ

0

সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ন্যস্ত করে আনা সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হাইকোর্টের আলোচিত রায় প্রকাশিত হয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে আসা ১৬৫ পৃষ্ঠার রায়টি আজ বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে আপলোড করা হয়েছে। যে দুই বিচারপতি ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করেছিলেন, আজ কেবল তাদের রায় প্রকাশিত হয়েছে। তাদের সাথে ভিন্নমত পোষণকারী বেঞ্চের অন্য বিচারপতির রায় এখনও আসেনি। চলতি বছরের ৫ মে হাইকোর্ট বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ন্যস্ত করে আনা সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন। সুপ্রিম কোর্টের নয় আইনজীবীর করা এক রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে জারি করা রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি মো. আশরাফুল কামালের বিশেষ বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠের মতের ভিত্তিতে ওই রায় দেন। ১৬৫ পৃষ্ঠার রায়টি লিখেছেন বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী। ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণার সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর সাথে একমত পোষণ করছেন বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক। এই মামলায় হাইকোর্টে রাষ্ট্রপক্ষে নিয়োজিত ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোতাহার হোসেন সাজু সাংবাদিকদের বলেন যে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে অর্থাৎ দুই বিচারপতি ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করেন। এই দুই বিচারপতির রায় প্রকাশিত হয়েছে। বেঞ্চের অন্য্য বিচারপতি মো. আশরাফুল কামালের দেয়া রায় এখন প্রকাশের অপেক্ষায়। হাইকোর্টের রায়ের পর তা স্থগিত চেয়ে ৮ মে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় একটি আবেদন করেছিলো। এ বিষয়ে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোতাহার বলেন, প্রকাশের অপেক্ষায় থাকা রায় অর্থাৎ পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার পর বিষয়টি শুনানির জন্য চেম্বার বিচারপতির আদালতে উপস্থাপন করা হবে। রায়ে বলা হয়েছে, রুল যথাযথ (অ্যবসলিউট) ঘোষণা করা হলো। ষোড়শ সংশোধনী আইন-২০১৪ কালারেবল, এটি বাতিল এবং সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করা হলো। রায়ে আদালত বলেন, বিভিন্ন দেশে সংসদ কর্তৃক বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা রয়েছে। আমাদের দেশের সংবিধানেও শুরুতে এই বিধান ছিলো। তবে সেটি ইতিহাসের একটি দুর্ঘটনামাত্র। এই প্রক্রিয়া কোনো কোনো দেশে এখনো বিদ্যমান। রায়ে আরো বলা হয়, কমনওয়েলথভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর ৬৩ শতাংশে ডিসিপ্লিনারি কাউন্সিলের মাধ্যমে বিচারপতি অপসারণের বিধান রয়েছে, সংসদের মাধ্যমে নয়। রায়ে আদালত আরো বলেন, আমাদের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে এখানকার ল’ মেকাররা (সংসদ সদস্য) পার্টির সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে পারেন না। দল যে সিদ্ধান্ত নেয় তার পক্ষেই তাদেরকে ভোট দিতে হয়। এমনকি তারা যদি মনে করেন যে, বিষয়টি সঠিক নয়, তারপরও দলের সিদ্ধান্তের বাইরে কোনো ভোট দিতে পারেন না। যদি ১৬তম সংশোধনী বহাল থাকে তাহলে বিচারপতিদেরকে সংসদ সদস্যদের করুণার প্রার্থী হতে হবে। রায়ে আদালত আরো বলেন, শুনানিকালে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা বলেছেন যে- যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডাসহ কিছু দেশে সংসদের হাতে বিচারপতি অপসারণ ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু ওইসব দেশের ল’ মেকারদের সাথে আমাদের দেশের ল’ মেকারদের মিলানো ঠিক হবে না। ওইসব দেশের ল’ মেকাররা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন। ওইসব দেশে আমাদের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের মতো কোনো বিধান নাই। আদালত রায়ে বলেন যে, বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন হলো- ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে পাবলিক পারসেপশন (জনগণের ধারণা) কী ছিলো? এক্ষেত্রে মূল পাবলিক পারসেপশন হলো- ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা।’ বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিষয়টি ক্ষুণ্ণ হতে পারে- জনমনে এমন ধারণা হলে বিচার বিভাগ টিকতে পারে না। ষোড়শ সংশোধনী আমাদের সংবিধানে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের যে নীতি আছে তার পরিপন্থি। একই সাথে সংবিধানের মৌলকাঠামো নীতিরও পরিপন্থি। এটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব করেছে। তাই এ বিষয়ে জারি করা রুল যথাযথ (বাই মেজরিটি ভিউ রুল অ্যাবসলিউট)। ষোড়শ সংশোধনী বাতিল ও অসাংবিধানিক। অসদাচরণের দায়ে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের কাছে ফিরিয়ে নিতে ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী আনা হয়। বিলটি পাসের পর একই বছরের ২২ সেপ্টেম্বর তা গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। ওই সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে একই বছরের ৫ নভেম্বর হাইকোর্টে এই রিট আবেদনটি দায়ের করা হয়। প্রাথমিক শুনানির পর হাইকোর্ট ২০১৪ সালের ৯ নভেম্বর রুল জারি করেন। রুলে ওই সংশোধনী কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিব, রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব, আইন সচিব, সংসদ সচিবালয়ের সচিবকে দুই সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়। এই রুলের উপর গত বছর ২১ মে শুনানি শুরু হয়। এরপর ১৭ কার্যদিবস রুলের উপর শুনানি হয়। গত ১০ মার্চ শুনানি শেষে আদালত রায়ের জন্য ৫ মে তারিখ ঘোষণা করেন। ৫ মে সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণা করা হলেও আজ তা সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। ১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধানে উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের উপর ন্যস্ত ছিল। ১৯৭৫ সালের ২৪ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে এই ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত হয়। পরে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনামলে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছে ন্যস্ত হয়। ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে ৯৬ অনুচ্ছেদে অন্তর্ভুক্ত ২ উপঅনুচ্ছেদে বলা হয়, ‘প্রমাণিত অসদাচরণ বা অসামর্থ্যরে কারণে সংসদের মোট সদস্য-সংখ্যার অন্যূন দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতার দ্বারা সমর্থিত সংসদের প্রস্তাবক্রমে প্রদত্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ ব্যতীত কোন বিচারককে অপসারিত করা যাইবে না।’ ৩ উপঅনুচ্ছেদ অনুসারে, ‘এই অনুচ্ছেদের ২ দফার অধীন প্রস্তাব সম্পর্কিত পদ্ধতি এবং কোন বিচারকের অসদাচরণ বা অসামর্থ্য সম্পর্কে তদন্ত ও প্রমাণের পদ্ধতি সংসদ আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করিতে পারিবেন।’ ইতোমধ্যে এই সংশোধনীর আলোকে একটি খসড়া আইন অনুমোদন করেছে মন্ত্রীসভা। প্রস্তাবিত আইনটি সংসদে উপস্থাপনের অপেক্ষায় ছিলো। কিন্তু তার আগেই এই বিষয়ে আনা সংশোধনীকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হলো।

Comments are closed.