rockland bd

ঢাবি’র মেধাবী ছাত্র শান্তর জন্য দুটি কৃত্রিম পা’ই গড়ে দিতে পারে উজ্জল ভষিষ্যত

0

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি
মঙ্গলবার, বাংলাটুডে টোয়েন্টিফোর:

প্রতিদিন আমাদের চারপাশে এমন অনেক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে যায় যা আমাদের মানবিক অনুভূতিকে দারুণভাবে নাড়া দেয়। অনেকে এসব দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেন, আবার অনেকে পঙ্গুত্ববরণ করায় তাদের মানস পটে লালিত রঙিন স্বপ্ন দুঃস্বপ্ন হয়ে প্রতিনিয়ত কুড়ে কুড়ে খায়। প্রতিদিন ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত এসব মানুষের জন্য আমরা কিছুদিন জন্য আবেগ তাড়িত হই। একসময় আমাদের মানবিক অনুভূতি বা আবেগ ক্রমশঃ স্তিমিত হয়ে আসে, নিভে যায়। জানিনা বা জানার চেষ্টাও করিনা কিভাবে চলছে তাদের জীবন। তবুও তারা বেঁচে থাকেন, বেঁচে থাকতে হয়। এমনি একজন সিরাজগঞ্জের তুখোর মেধাবী ছাত্র ট্রেন দুর্ঘটনায় দু’টি পা হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছে। পিতা-মাতার স্নেহের ধন ভবিষ্যতে সংসারের জোয়াল কাঁধে নেয়ার একমাত্র ভরসা সেই পুত্র এখন পঙ্গু। সে এখন চলতে পারেনা, বলতেও পারেনা তার স্বপ্ন ভঙ্গের দুঃখের কথা। কে শুনবে তার করুন কাহিনী। কার কোমল হৃদয়ে রেখাপাত করবে এই মেধাবী তড়তাজা যুবকের দুটি পায়ের বিকল্প হিসেবে কৃত্রিম পা সংযোজনে পাশে দাঁড়াতে। সে আশায় বুক বেঁধে আছে সিরাজগঞ্জ পৌর এলাকার মীরপুর বিড়ালাকুঠি মহল্লার অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক শাহজাহান আলী খানের ছেলে শফিউল আলম খান শান্ত। সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ফলিত গণিত বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষে লেখাপড়া করছিলো। দুর্ঘটনার কারণে শিক্ষাজীবন থেকে ইতিমধ্যেই ঝরে গেছে একটি বছর। এখন সে ভবিষ্যত শিক্ষাজীবন নিয়ে চরম শঙ্কার মধ্যদিয়ে দিন পার করছে। বাকী জীবন কিভাবে কাটবে সে চিন্তাই এখন তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে।
এ প্রতিনিধির সাথে একান্ত আলাপচারিতায় মেধাবী এ ছাত্র জানিয়েছে, দুটি কৃত্রিম পা’ই ফিরে দিতে তার জীবনের গতি। পড়ালেখা শেষ করে দেশ ও মানবতার সেবায় আত্মনিয়োগ করতে চায় সে। পিতা-মাতার দু’সন্তানের মধ্যে শান্ত ছোট। বড় ভাই শাহ আলম তার চাচার টিনের দোকানের ব্যবসা দেখাশোনা করেন, মা গৃহিনী। শান্ত লেখাপড়ায় ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। স্কুলজীবন শেষ করে সিরাজগঞ্জের বিএল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় এবং কলেজজীবন শেষ করে ঢাকার উত্তরা মডেল কলেজ থেকে। ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে ঢাবিতে ফলিত গণিত বিষয়ে ভর্তি হয়ে ফজলুল হক হলে থেকে পড়ালেখা করতো। সে শুধু মেবাবী ছাত্রই নয়, চৌকস গুনাবলীর অধিকারীও বটে। লেখাপড়ার পাশাপাশি চিত্রাঙ্কণ, রচনা, আবৃতি ও হাতের লেখা প্রতিযোগিতায়ও তার প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছে। বৃটিশ কাউন্সিলসহ জেলা পর্যায় থেকে অর্জন করেছে অনেক পুরস্কার।
সে জানায়, ২০১৮সালের ২২জানুয়ারি স্বরসতী পুজার ছুটি শেষে সকালে সিরাজগঞ্জের শহীদ এম. মনসুর আলী ষ্টেশন থেকে সিরাজগঞ্জ এক্সপ্রেক্স ট্রেনযোগে ঢাবি’র উদ্দেশে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়। স্টেশনে পৌঁছার আগেই ট্রেন ছেড়ে দিলে দৌড়ে চলন্ত ট্রেনে উঠতে গিয়ে পা পিছলে ট্রেনের নিচে পড়ে যায়। চোখের নিমিষে চিরতরে হারিয়ে ফেলে শরীরের অতিগুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ‘দুটি পা’। চির জীবনের জন্য শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় ডান পায়ের হাঁটুর উপরের ও বাম পায়ের হাঁটুর নিচের অংশ।
পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে সিরাজগঞ্জ সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন। সেখানে চিকিৎসা চলে টানা এক মাস সতের দিন। বাবার রিটায়মেন্টের টাকাসহ ধারদেনা করে খরচ হয়ে যায় প্রায় ১৫লাখ টাকা।
এদিকে, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শান্তর শারীরীক অবস্থার খোঁজ-খবর নিতে যান ঢাবি’র ফলিত গণিত বিভাগের চেয়ারম্যানসহ কয়েকজন শিক্ষক। তারা শান্তর সমস্ত চিকিৎসা খরচ বহনসহ উন্নতমানের দুটি কৃত্রিম পা সংযোজনেরও প্রতিশ্রুতি দেন। তবে, এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি। এছাড়া সামাজের বিত্তশালী ব্যক্তি বা সেবামূলক প্রতিষ্ঠানও দাঁড়ায়নি তার পাশে।
তার মমতাময়ী মাতা শাহিদা খানম কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন- আমার শান্ত আগে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিরে মা বলে ডাক দিয়ে আমার বুকে মাথা রাখতো, জড়িয়ে ধরতো। সেগুলো এখন শুধুই স্মৃতি। আজ সেই নাড়ি ছেঁড়া বুকের ধন নিরব নিস্তব্ধ হয়ে পরেছে। মানুষ দেখলে শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। এক সময় সে ছিলো বেশ চঞ্চল। কারও বিপদের কথা শুনলেই ছুটে যেতো। প্রতিবেশী ও বন্ধুরাও তাকে অনেক ভালোবাসতো, স্নেহ করতো। এখন মাঝে মধ্যে বন্ধুরা এসে তাকে সঙ্গ দেয়, শান্তনা দেয়। কিন্তু তার মনতো প্রবোধ মানেনা। সে পূর্বের মতো স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে চায়। এজন্য জরুরী প্রয়োজন দুটি কৃত্রিম পা। অথচ এখন আর কৃত্রিম পা সংযোজনের ব্যয়ভার বহন করার সামর্থ্য তাদের নেই। যেহেতু ইতিপূবেই তার চিকিৎসা বাবদ অসহায় পিতা-মাতা অনেক কিছু ক্ষতি করে প্রায় ১৫লাখ টাকা ব্যয় করে ফেলেছেন। এখন ছেলেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আনার সাধ থাকলেও সাধ্য নেই তাদের।
এমন পরিস্থিতিতে এ মেধাবী চৌকস ছাত্রের মানবিক বিষয়টি যদি কারো কোমল হৃদয়ে রেখাপাত করে তাহলে আবারও স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারবে শান্ত। লেখাপড়া শেষ করে দেশ ও মানবতার সেবায় নিয়োজিত করতে পারবে নিজেকে। একটি অসহায় পরিবারের মুখে ফুটবে সুখের হাসি।
মেধাবী ছাত্র শফিউল আলম খান শান্ত বলে, মানবতার মা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতিপূর্বে অনেক অসহায় পরিবারকে সহায়তা করে তাদের উজ্জল ভবিষ্যত গড়ে দিয়েছেন। তার সহায়তা পেলে আমিও ফিরে পেতে পারি স্বাভাবিক জীবন। লেখাপড়া শেষে আত্মনিয়োগ করতে পারবো দেশ ও মানবতার কল্যাণে।
জেহাদুল ইসলাম/রাকিব

Comments are closed.