rockland bd

মধুমতির তীরে অনুমোদন ছাড়াই অবৈধ ইটভাটা

0

ফরিদপুর প্রতিনিধি
বৃহস্পতিবার, বাংলাটুডে টোয়েন্টিফোর:
ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার সাথে মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার সীমান্ত। মধুমতি নদী দ্বারা বিভক্ত এই সীমান্ত রেখায় গড়ে ওঠেছে বেশ কয়েকটি অবৈধ ইটভাটা। কোন প্রকার নিয়মকানুন, পরিবেশ দূষণের তোয়াক্কা না করেই ফসলী জমিতে টিনের তৈরি ড্রাম চিমনি ব্যবহার করে ইট পোড়াচ্ছে ভাটাগুলো।
কেটে নেয়া হচ্ছে কৃষিজমির টপসয়েল, নদী তীরের মাটি। এসকল ইটভাটার পাশে কৃষিজমি, বসতবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বনা ল থাকার পরও প্রতিনিয়ত নির্গমন করা হচ্ছে কার্বনডাইঅক্সাইড।
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায় মধুমতি নদীর পশ্চিম পাড়ে মহম্মদপুর উপজেলার মূল ভূ-খন্ড। নদীর পূর্ব পাড়ে বোয়ালমারী উপজেলার সাথে রয়েছে মহম্মদপুর উপজেলার রুইজানি ও জাঙ্গালিয়া মৌজার ফসলি জমি। ওই জমিতে রুইজানি মৌজায় মেসার্স নদী ব্রিকস ও এসটিসি ব্রিকস নামে দুটি এবং জাঙ্গালিয়া মৌজায় শরীফ ব্রিকস নামে একটি মোট তিনটি ভাটায় ইট পোড়ানোর কাজ চলছে। এছাড়াও ওই এলাকায় আরো কয়েকটি ভাটা স্থাপনে কাজ শুরু হয়েছে।
ভাটাগুলোতে টিনের তৈরি ড্রাম চিমনি ও কাঠ ব্যবহার করে ইট পোড়ানো হচ্ছে, আর ইট তৈরীর মাটি নেওয়া হচ্ছে মধুমতি নদী থেকে। অথচ ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) ২০১৩ এ বলা হয়েছে- লাইসেন্স ছাড়া ইটভাটা করা যাবে না। কোন ব্যক্তি ইট প্রস্তুতে কৃষিজমি কিংবা পাহাড় কেটে মাটি ব্যবহার করতে পারবে না। অনুমতি ছাড়া খাল, পুকুর, নদীরপাড় কিংবা চরা ল কেটে মাটি সংগ্রহ করতে পারবে না।
ওই অঞ্চলের একাধিক বাসিন্দা জানান, প্রতিদিন এই ইট-ভাটা গুলোতে ট্রাককে ট্রাক ছোট বড় গাছ পোড়ানো হচ্ছে। তারা জানান, দুই জেলার সিমান্ত হওয়ায় কোন প্রশাসনই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে না। এতে স্থানীয় বাসিন্দারা রয়েছে স্বাস্থ্য ঝুকিতে।
স্থানীয় একটি গাড়ী চালক আইনাল মোল্লা জানান, মধুমতি নদীর পলি কেটে ভাটা মালিকরা ইট তৈরী করছে, এছাড়া টিনের তৈরি ছোট ড্রাম চিমনি ব্যবহার করায় প্রচুর পরিমান কালো ধোয়ার সৃষ্টি হচ্ছে। তিনি বিষয়টি এখনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে জোড় দাবি করেন।
বোয়ালমারীর বাসিন্দা রাসেল আহমেদ জানান, দুই জেলার সিমান্ত এলাকা হওয়ায় সুবিধা নিচ্ছে অবৈধ ভাটা মালিকরা। তিনি অভিযোগ করে বলেন, মধুমতি নদীর পাড়ে গড়ে উঠা ইট-ভাটা মালিকদের নেই কোনো সরকারি অনুমোদন, যে কারনে ইচ্ছা-খুশি মতো ছোট বড় গাছ পোড়াতে পারছে। তিনি বলেন, এই ভাবে গড়ে ওঠা ইট-ভাটার কারনে সরকার হারাচ্ছে রাজস্ব।
অবৈধ ইট-ভাটা স্থাপনের বিষয়ে নদী ব্রিকসের অংশীদার মিনহাজুল ইসলাম জানান, আমরা নতুন শুরু করায় অস্থায়ী ভিত্তিতে ইট পোড়ানোর কাজ করছি। ভবিষ্যতে সব নিয়মকানুন মেনে পরিবেশ বান্ধব ভাটা করব। পরিবেশের ক্ষতি ও কাঠ পোড়ানোর অনিয়ম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা বিভিন্ন জায়গা ম্যানেজ করে আপাতত কাজ চালাচ্ছি। ওই ভাটার অপর অংশীদার ফয়সাল আহমেদ মাসুদ বলেন, নিয়ম মেনে ইট ভাটা করা খুব কঠিন। তাই আমরা স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই ভাটা চালাচ্ছি।
শরীফ ব্রিকসের অংশীদার শরীফুল ইসলাম জানান, পরিবেশ বান্ধব ১২০ ফুট উচু চিমনি তৈরি করতে প্রচুর ইটের প্রয়োজন। এজন্য আমরা নিজেদের তৈরি ইট দিয়েই ভবিষ্যতে পরিবেশ বান্ধব চিমনি বানাবো। এমুহুর্তে আমাদের ভাটার কোন পরিবেশ ছাড়পত্র বা জেলা প্রশাসনের লাইসেন্স নেই। ভবিষ্যতে সব কিছুই পাকা পোক্ত ভাবে করবো।
এসটিসি ব্রিকসের মালিক জাফর মোল্লা জানান, আমাদের কোনো অনুমতি নেই, তবে আগামীতে সরকারের কাছে অনুমতির জন্য আবেদন করবো। তিনি বলেন, অটো ভাটা করতে অনেক অর্থের প্রয়োজন, যে কারণে আমরা শুরুতে টিনের তৈরি ড্রাম চিমনি দিয়ে ইট-পোড়াচ্ছি। কাট বা গাছ পোড়ানো বিষয়ে বলেন, ড্রাম চিমনিতে কাট বা গাছ ছাড়া ইট পোড়ানো হয় না।
ফরিদপুর জেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সহসভাপতি, বোয়ালমারীর মেসার্স রাজ ব্রিকস এর স্বত্বাধিকারী শ্যামল কুমার সাহা বলেন, বোয়ালমারী উপজেলার সীমান্ত এলাকায় গড়ে ওঠা অবৈধ ইটভাটাগুলোর সাথে আমরা রীতিমতো প্রতিযোগিতায় মার খাচ্ছি। তাঁরা কাঠ দিয়ে ইট পুড়িয়ে পরিবেশের ক্ষতি করছে আর আমরা পরিবেশ দূষণ রোধে বেশি ব্যয়ে কয়লা দিয়ে ইট পোড়াচ্ছি। অনুমোদনের বালাই না থাকায় ওই ভাটাগুলোকে সরকারি কোন ভ্যাট ট্যাক্স পরিশোধ করতে হচ্ছে না। ফলে তাঁরা আমাদের চেয়ে অনেক কম দামে ইট বিক্রি করতে পারছে।
অবৈধ ইট-ভাটার বিষয়ে ফরিদপুর চেম্বার অব কমার্সের সিনিয়র সহসভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান জানান, অবৈধ ভাটা স্থাপনের কারনে বৈধ ভাটা মালিকরা ক্ষতিগ্রস্থ হোত এটা কেউ চায় না। তাছাড়া অবৈধ ভাটা মালিকদের তো সরকারি রাজস্ব দিতে হয় না, লাইন্সেস নবায়ন করতে হয় না।
তিনি দাবি করে বলেন, বিষয়টি দুই জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার । তা না হলে বৈধ ব্যবসায়ীরা অথিক ক্ষতিতে পড়বে।
ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক উম্মে সালমা তানজিয়া জানান, ইট-ভাটার বিষয়ে আমরা জেলা ভাটা -মালিকদের সরকারি নির্দেশ জানিয়ে দিয়েছি। ইতিমধ্যে অনেকেই তার মেনে চলছে। তিনি বলেন, পরিবেশর ক্ষতি হয় এমন কোনো কাজে জেলা প্রশাসনের ছাড় নেই।
ফরিদপুর ও মাগুরার সিমান্ত এলাকায় গড়ে ওঠা অবৈধ ভাটার বিষয়ে সরকারি এই কর্মকর্তঅ বলেন, এব্যাপারে পাশ্র্¦বর্তী মাগুরা জেলা প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে পরিবেশ দূষন রোধে সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নেব।
কে এম রুবেল/রাকিব

Comments are closed.