rockland bd

ব্র্যাকের ৩০ হাজার বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেছে

0

ব্র্যাকের ৩০ হাজার বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেছে

ডেস্ক রিপোর্ট, ঢাকা
রবিবার, বাংলাটুডে টোয়েন্টিফোর:
দেড় দশক আগেও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বেশির ভাগ গ্রামেই বিদ্যালয় ছিল না। আবার অনেক এলাকায় বিদ্যালয় থাকলেও ছিল না পর্যাপ্তসংখ্যক শিক্ষক ও শ্রেণীকক্ষ। এর ফলে শিশুদের বড় অংশই ছিল বিদ্যালয়বিমুখ।
প্রাথমিক শিক্ষার এমন নাজুক পরিস্থতিতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর শিশুদের শিক্ষার আওতায় আনতে কাজ শুরু করে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক। এক শ্রেণীকক্ষ ও এক শিক্ষক কর্মসূচির মাধ্যমে গড়ে তোলে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়।
২০০৫-০৬ সালের দিকে ব্র্যাক পরিচালিত প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৪০ হাজার। কিন্তু বিদেশী অনুদান কমে যাওয়া ও সরকারি বিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এখন ক্রমান্বয়ে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ব্র্যাকের এসব স্কুল। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ব্র্যাক পরিচালিত প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১০ হাজারের কিছু বেশি। সে হিসাবে গত এক যুগে ব্র্যাক পরিচালিত প্রায় ৩০ হাজার স্কুলই বন্ধ হয়ে গেছে।
বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক ডা. মুহাম্মদ মুসা বলেন, আমরা যখন শিক্ষা কর্মসূচি শুরু করি, তখন দেশের প্রাথমিক শিক্ষার অবস্থা ছিল অত্যন্ত নাজুক। প্রত্যন্ত অঞ্চলের এলাকাগুলোয় বিশেষ করে হাওড়াঞ্চল ও নদীভাঙন কবলিত অঞ্চলগুলোর সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা করে দেয়াই ছিল আমাদের লক্ষ্য।
সময়ের পরিক্রমায় দেশের প্রাথমিক শিক্ষার প্রসার ঘটেছে। বিশেষ করে গত কয়েক বছরে ঝরে পড়ার হার অনেক কমেছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতেও সরকারি উদ্যোগে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
এর ফলে আমাদের স্কুলের সংখ্যাও কমেছে। এক সময় প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক মিলে ৩৫-৪০ হাজারের মতো স্কুল ছিল। এখন স্কুলের সংখ্যা অনেক কম।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের গত কয়েক বছরের বিদ্যালয়শুমারিতেও ব্র্যাকের স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।
গত কয়েক বছরের শুমারির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রতি বছরই ব্র্যাকের বন্ধ হয়ে যাওয়া স্কুলের সংখ্যা বাড়ছে। ২০১৫ সালে দেশে ব্র্যাক পরিচালিক প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল ১৩ হাজার ৫২২টি।
২০১৬ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১২ হাজার ৭৬৭টিতে। ২০১৭ সালে দেশে ব্র্যাক পরিচালিত প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল ১২ হাজার ৩৯৪টি। ২০১৮ সালে এ সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৩১৮টিতে।
ব্র্যাকের বন্ধ হওয়া স্কুলগুলোর একটি নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার রণচণ্ডী খদ্দপাড়া ব্র্যাক স্কুল। ২০১০ সালে বিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। এ স্কুল থেকে ৩০ জন শিক্ষার্থী প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করে। যদিও প্রতিষ্ঠার চার বছরেই ২০১৬ সালে বিদ্যালয়টির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
স্কুলটির শিক্ষক সেলিনা খাতুন বলেন, কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় বিদ্যালয়টির কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়। এরপর ব্র্যাকের আরেকটি উদ্যোগ শিশু নিকেতনের কার্যক্রম শুরু করা হয়। কিন্তু শিশু নিকেতনের খরচ অভিভাবকদের চালাতে হয়। তাই কয়েক মাস পর শিশু নিকেতনের কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায়।
ব্র্যাকের শিক্ষা কর্মসূচি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েক বছর ধরে আমেরিকা, ইউরোপ এবং অস্ট্রেলিয়ার দাতা সংস্থাগুলো অনুদান কমিয়ে দিয়েছে। গত কয়েক বছরে শিক্ষা খাতে ব্র্যাকের অনুদান প্রাপ্তির হার প্রায় ৮০ শতাংশ কমে গেছে। এ কারণেই স্কুলগুলোর কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে হচ্ছে বেসরকারি এ সংস্থাকে।
এ বিষয়ে ডা. মুহাম্মদ মুসা বলেন, দাতা সংস্থাগুলো অনুদানের ক্ষেত্রে আগের তুলনায় অনেক কৌশলী হয়েছে। অনুদান কমিয়ে দিয়েছে বিষয়টি তেমন নয়। তবে অনুদানের খাত ও অঞ্চল নির্বাচনের ক্ষেত্রে অনেক পরিবর্তন এসেছে।
জানা গেছে, বেশির ভাগ স্কুল বন্ধ হয়ে গেলেও শিশু নিকেতন নামে শিক্ষা কর্মসূচি পরিচালনা করছে ব্র্যাক। তবে এক্ষেত্রে সব খরচ বহন করতে হয় অভিভাবকদের। তাই শিশু নিকেতনে খুব বেশি শিক্ষার্থী পাওয়া যাচ্ছে না।
এছাড়া মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে ব্র্যাক। মাধ্যমিক পর্যায়ে ঝরে পড়ার হার অনেক বেশি হওয়ায় এ প্রকল্পটি নেয়া হয়েছে।
বর্তমানে পরীক্ষামূলকভাবে কিছু বিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির কর্মকর্তারা। ২০১৩ সালে সাতটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় নিয়ে যাত্রা হলেও বর্তমানে মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে ১৪টি।
সরকারি বিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়ে যাওয়াকে ব্র্যাকের স্কুল কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে দেখছেন শিক্ষা খাতসংশ্লিষ্টরা।
তারা জানান, বর্তমানে দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৩৮ হাজার ৯১৬। নতুন করে জাতীয়করণকৃত প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ২৬ হাজার ৬১৩। এর ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও পৌঁছে যাচ্ছে সরকারের শিক্ষা কার্যক্রম।
এ বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, এক সময় দেশের প্রাথমিক শিক্ষার উল্লেখযোগ্য অংশই ছিল বেসরকারি খাতে। যেসব এলাকায় সরকারি বিদ্যালয় করা যায়নি, সেসব এলাকায় দাতা সংস্থাগুলোর আর্থিক সহায়তায় বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা করত।
তবে প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে এখন সে চিত্র বদলে গেছে। বিশেষ করে গত ১০ বছরে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগে প্রাথমিক শিক্ষার বেশির ভাগ অংশই সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে।
প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোয় বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। সরকারি বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য উপবৃত্তির পাশাপাশি মিড-ডে মিল চালু করা হয়েছে। সরকারি স্কুলের বাইরে রস্কসহ বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায়ও বিদ্যালয় চালু করা হচ্ছে। সরকারের এসব উন্নয়নের ফলে এনজিও পরিচালিত স্কুলগুলোর প্রয়োজনীয়তা কমে এসেছে। পর্যাপ্তসংখ্যক শিক্ষার্থী না পাওয়ায় বিদ্যালয়গুলো ক্রমে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সূত্র: বণিক বার্তা

আর এইচ

Comments are closed.