rockland bd

স্বাধীনতার ৪৭ বছরেও রাণীনগরের আতাইকুলা বধ্যভূমির স্বীকৃতি মিলেনি

0

স্বাধীনতার ৪৭ বছরেও রাণীনগরের আতাইকুলা বধ্যভূমির স্বীকৃতি মিলেনি

রাণীনগর প্রতিনিধি,
শুক্রবার, বাংলাটুডে টোয়েন্টিফোর:
নওগাঁর রাণীনগরের আতাইকুলা গ্রামের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বহনকারী একমাত্র ঐতিহাসিক বধ্যভূমিতে স্বাধীনতার ৪৭ বছর বছরেও উন্নয়নের কোন ছোঁয়া লাগেনি। জোটেনি জাতীয়ভাবে কোন স্বীকৃতি।
পাক-হানাদার বাহিনীর হাতে নিহত ৫২ জন শহীদদের পরিবার এখনও পায়নি কোন স্বীকৃতি, সাহায্য সহায়তা, বিধবা ভাতা কিংবা বয়স্ক ভাতা। বাড়ীর কর্তাদের হারিয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছে এই সব শহীদ যোদ্ধা পরিবারের সদস্যরা।
আজ এই পরিবারের অনেকেই মানুষের বাড়ী বাড়ী ঝি এর কাজ করছেন।
বধ্যভূমিটি শহীদ পরিবারের সদস্যরা নিজেদের উদ্দ্যোগে কোন রকমে ইটের প্রাচীর দিয়ে ঘিরে রেখেছে মাত্র। শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে এলাকাবাসীদেরও দাবী শহীদ পরিবারের এই বধ্যভূমি স্থানে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ ও জাতীয় ভাবে স্বীকৃতি।

ওই দিনের নারকীয় ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়েও বেঁচে যাওয়া আতাইকুলা গ্রামের প্রদ্যুত চন্দ্র পাল, সাধন চন্দ্র পাল ও নিখিল চন্দ্র পাল ওই দিনের করুন হত্যাযজ্ঞের কাহিনী অশ্রুসিক্ত নয়নে বলেন, ১৯৭১ সালের ২৫ এপ্রিল রবিবার সকাল ১০টায় ছোট যমুনা নদী পার হয়ে আসে একদল হানাদার বাহিনী। মুক্তিযোদ্ধারা এই গ্রামে আছে বলে তারা সন্দেহ করে প্রথমে গ্রামটিকে ঘিরে ফেলে প্রতিটি বাড়ী থেকে নগদ টাকা স্বর্নালংকাসহ বাড়ীর নারী পুরুষকে ধরে নিয়ে ওই গ্রামের বলরাম চন্দ্রের বাড়ীর উঠানে নিয়ে যায়। সেখানে পুরুষদের উঠানে সারিবদ্ধ করে দাঁড়িয়ে রাখে আর উঠানের পাশেই নারীদের এক ঘরে রাখে। একের পর এক নারীদের উপরে চালায় পাশবিক নির্যাতন। পরে সারিবদ্ধ পুরুষদের উপরে চলে ব্রাশ ফায়ার। মুহুর্তের মধ্যেই ওই গ্রামের ৫২ জন শহীদ হন। পরে তারা বিভিন্ন বাড়ীতে লুটপাটসহ অগ্নিসংযোগ করে চলে যায়। শহীদদের মধ্য থেকে গুলিবিদ্ধ হয়েও কোন রকমে বেঁচে যায় প্রদ্যুত পাল, সাধন পাল ও নিখিল পাল।
প্রদ্যুত পাল জানান, ওই দিন তার বাবা, কাকা জ্যাঠা এবং গ্রামের লোকজনের সাথে তাকেও সারিবদ্ধ করে চালায় ব্রাশ ফায়ার।
হানাদার বাহিনীরা চলে যাবার পর রক্তাক্ত ও গুলিবিদ্ধ অবস্থায় লাশের মধ্য থেকে কোন রকমে বেঁচে গিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় সে তার বাড়ীতে যায়।
তিনি জানান, সবাইকে হারিয়ে আমরা নিঃস্ব হয়েছি। স্বাধীনতার ৪৭ বছরেও কোন সরকারের আমলে এই শহীদ পরিবারগুলো এখনও কোন স্বীকৃতি কিংবা সাহায্য-সহায়তা পায়নি। কোন স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে উঠেনি এই বধ্যভূমি।
সাবেক সংসদ সদস্য শাহীন মনোয়ারা হক, ১৯৯৬ সালে নিজ উদ্যোগে কিছু অনুদান দিয়ে কোন রকমে ফলকে শহীদদের নাম লিপিবদ্ধ করলেও পরবর্তিতে আর কোন কাজ হয়নি।
বধ্যভূমিটি পরে আছে অযত্ন অবহেলায়।
সাধন পাল জানান, এখানে সেই সময় ৩দিন ধরে ৫২টি লাশ পরে থাকার পর পাশের গ্রামের লোকজনরা এসে কোন রকমে ঘটনাস্থলের পাশেই মাটি খুঁড়ে পুঁতে রাখে।
নিখিল পাল জানান, যুদ্ধে বেঁচে গেলেও আজও তাদের ভাগ্যের কোন উন্নতি হয়নি। কোন রকমে হারিয়ে যাওয়া পাল সম্প্রদায়ের মাটির ব্যবসা করে বেঁচে আছে তারা।
বিধবা রেনু বালা, ফেন্তু বালা ও সবেজু বালা তাদের সেই দিনের করুন কাহিনীর বর্ণনা দিতে গিয়ে তারা বলেন, স্বামীকে হারিয়ে ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের নিয়ে অনেক দুখে কষ্টে, অন্যের বাড়ীতে ঝি এর কাজ করে এখনও বেঁচে আছেন তারা।
দুঃখের সাথে তারা আরও বলেন এখনও কোন সরকার তাদের কোন সাহায্য সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয় নাই। তাদের ভাগ্যে জোটেনি বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি। অবিলম্বে সরকারি ভাবে শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে সেখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হোক এবং এই সব অসহায় সুবিধা বঞ্চিত শহীদ পরিবারগুলোকে যথাযথ মর্যাদা প্রদান করা হোক বলে জোর দাবী এলাকাবাসী ও শহীদ পরিবারদের।
স্থানীয় সংসদ সদস্য মো: ইসরাফিল আলম বলেন, বর্তমান সরকার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার। এই বধ্যভূমির সংস্কার ও জাতীয় ভাবে স্বীকৃতির জন্য মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রনালয় বরাবর একাধিকবার আবেদন করেছি। এই গ্রামে যে ক’জন বীরঙ্গনা বেঁচে আছেন তাদের স্বীকৃতি ও সকল সুযোগ-সুবিধার জন্যও আমি অনেকবার মন্ত্রণালয়কে মৌখিক ও লিখিত ভাবে জানিয়েছি। আশা করছি অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বীরঙ্গনাদের স্বীকৃতিসহ এই বধ্যভ’মির আধুনিকায়নের কাজ শুরু করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

রহিদুল ইসলাম রাইপ/আর এইচ

Comments are closed.