rockland bd

রাজনৈতিক বাঁক বদলের মুহূর্ত বাংলাদেশের নির্বাচন!

0

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

আফসান চৌধুরী:
বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচন ছিল জটিল বিষয় কিন্তু ভিত্তিটা ছিল সাধারণ। ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে তৃতীয়বারের মতো নির্বাচিত হয়েছে আওয়ামী লীগ। বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন ঘোষণা দিয়েছে যে ৮০ শতাংশ ভোট পড়েছে নির্বাচনে, সেই হিসেবে এই মাত্রাটা বিশাল। ক্ষমতাসীন দলের এখন ২৫৭টি আসন আর জোটভুক্ত জাতীয় পার্টির রয়েছে ২২টি আসন। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি মাত্র পাঁচটি আসন পেয়েছে। মনে হচ্ছে যেন ভোটাররা বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একদলীয় শাসন আনার জন্য মরিয়া হয়ে ছিল, যেটাকে ‘বাঁক বদলের’ সময় হিসেবে উল্লেখ করা যায়।

বিএনপির পরাজয়টা এমন পরিপূর্ণ ছিল যে তাদের নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে পুনর্নির্বাচন আহ্বান করা ছাড়া কোন উপায় ছিল না, যে দাবিকে নাকচ করে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। আওয়ামী লীগ আমন্ত্রণ জানালেও নির্বাচিত বিএনপি এমপিরা শপথ নিতে অস্বীকার করেছেন। এখন পর্যন্ত সবকিছু ভালো আর সহজ মনে হলেও, আসছে দিনগুলো আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

নির্বাচন শেষ হয়েছে, রাজনীতি নয়

১৮ বছর পর এমন একটা নির্বাচন হলো যেখানে সব দলগুলো অংশগ্রহণ করেছে। আগের নির্বাচনটি হয়েছিল ২০০১ সালে, যেখানে বিএনপি-জামায়াত জোট জয়লাভ করেছিল। ২০১৪ সালে বিএনপি নির্বাচনের বাইরে ছিল এবং আন্দোলনের ডাক দিযেছিল। দাবির মধ্যে কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিষয়টিও ছিল। সেই আহ্বান ব্যর্থ হয়েছে এবং আওয়ামী লীগ ফাঁকা মাঠে এক দশক সরকার চালিয়ে গেছে। ২০১৮ সালেও একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি হয়েছে, যদিও সব দল এখানে অংশ নিয়েছে। বিএনপি এবং জনগণের একটা অংশ ভাবতে পারেন যে ২০১৮ সালের নির্বাচন সাজানো নির্বাচন, কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না। কারণ নির্বাচন শেষ হয়ে গেছে এবং পার্লামেন্ট গঠিত হতে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের ১১তম পার্লামেন্টে অর্থপূর্ণ বিরোধী দল থাকবে না কারণ দ্বিতীয় বৃহত্তম দল জাতীয় পার্টি খুব একটা ভালো অবস্থায় নেই। তাছাড়া, ২৫০+ সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিপরীতে ২০+ আসন নিয়ে কার্যকর বিরোধী দল গড়াও যায় না। তবে, জাতীয় পার্টির অনুগত আচরণ, দলের প্রধান এইচ এম এরশাদের অনির্ভরযোগ্য আচরণ এবং সাবেক স্বৈরশাসকের দল হিসেবে তাদেরকে ভালো বিরোধী দল হিসেবে গ্রহণ করাও যায় না। এটাকে বরং ‘ব্যাক-আপ’ দল বললে সঠিক হবে।

সিট বণ্টন এবং ভারসাম্যের বিষয়টি বিবেচনা করলে পার্লামেন্টের চেয়ে রাজপথেই বেশি হাই-প্রোফাইল নেতারা থাকবেন। পার্লামেন্টারি কর্মকাণ্ড এতটাই একপেশে হয়ে পড়বে যে, সেটা কোন অর্থবহ কিছু হবে না। ২০১৪ সালে নির্বাচন থেকে বিরত থেকে বিএনপি যদি কোন ভুল করে থাকে, তাহলে এবার আওয়ামী লীগের পক্ষে “ব্যাপক ভোট দিয়ে” জাতীয় রাজনীতিতে আবারও সমস্যার তৈরি করলো তারা। সরকার এখানে হাতির মতো আর বাকিরা ছোটখাটোর পাখির মতো হয়ে আছে।

বিএনপির প্রান্তিকীকরণ

২০০৮ সালে বিএনপির বিচ্ছিন্ন হওয়া শুরু হয়েছে, আওয়ামী লীগের সমস্যা হবে তাদের সাফল্যকে কাজে লাগানো। রাজনৈতিক অঙ্গন যদি একটি মাত্র দলের দখলে থাকে, তাহলে রাজনীতি কিভাবে বহুমুখী ও বিনিময়ের হবে, সাংবিধানিক লক্ষ্য হিসেবে দায়বদ্ধতার কথা না-ই বা বললাম? এমন অবস্থা হয়েছে যে, নতুন নির্বাচিত আওয়ামী লীগ নেতারা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে ‘বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতি শেষ’ করার সময় এসেছে। হাঁ, একটা মজার আকাঙ্ক্ষা বটে।

বিএনপি কঠোর অবস্থানে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে এবং আবারও আন্দোলনের ডাক দিতে পারে, বর্তমান বাস্তবতায় যেটা হবে আত্মহত্যার সমতুল্য। সেটা সম্ভব যদি দলের নেতাকর্মীরা আইনি হয়রানি এবং কারাবরণকে মেনে নিতে পারে। রাজনৈতিক জটিলতা আরও বেড়েছে, কারণ নির্বাচনে বড় ধরনের বিপর্যয় সত্বেও বিএনপি সামান্য কয়েকটি আসন নিয়েও এখনও প্রধান দল হিসেবে রয়ে গেছে।

জাতীয় পার্টি পুরোপুরি আওয়ামী লীগের উপর নির্ভরশীল আর বিএনপির সাথে ক্ষমতাসীন দলের যোগাযোগের সকল সেতুই যেন ধসে গেছে। কার্যত, বহুদলীয় পার্লামেন্টের দুয়ার যেন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এটা একটা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি এবং পার্লামেন্ট কি ভূমিকা রাখে সেটা এখন দেখার বিষয়। সরকার কিভাবে বহুদলীয় বা একদলীয় গণতন্ত্রের চর্চা করে, সেটাও এখন দেখার বিষয়।

আওয়ামী লীগ যেহেতু একমাত্র ক্ষমতার অংশীদার, ২০১৪ সাল থেকেই কার্যত যেটা চলে আসছে, সে ক্ষেত্রে ভবিষ্যতের সকল অর্জন ও ব্যর্থতার দায় তাদের কাধেই বর্তাবে। আর পার্লামেন্টের বাইরে এই চ্যালেঞ্জটা পার্লামেন্টের ভেতরের চেয়ে আরও কঠিন হবে।

অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সুশাসনই মূল চাবিকাঠি

সরকারসহ কেউই অস্বীকার করবে না সুশাসনের অবস্থা এখন দুর্বল, বিশেষ করে অর্থনৈতিক খাতে। অর্থনীতিবিদরা বলেছেন যে, ব্যাংকগুলোর তাৎক্ষণিক সহায়তা দরকার এবং সেটা না পেলে খারাপ পরিণতি অপেক্ষা করছে। কিন্তু কিভাবে সেটা করা হবে এটা স্পষ্ট নয়, কারণ এই পতনটা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। এই পতনকে ঠেকানোর জন্য তেমন কিছুই করা হয়নি বা করা সম্ভবও না। কারণ অর্থনীতি এখন ‘সংযোগের’ ভিত্তিতে চলছে, আর্থিক নীতির ভিত্তিতে নয়। তবে, ব্যাংকাররা নিজেরা অবশ্য মিডিয়াকে বলেছে যে, তারা ভালোই আছে।

অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে, বিশেষ করে ঢাকার বাইরে, কিন্তু বৈষম্য বেড়েছে। শহুরে দারিদ্রের হার বেড়ে গেছে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির খাতটি খুঁড়িয়ে চলছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় এনজিও ব্র্যাকের এক জরিপে দেখা গেছে, তরুণদের অগ্রাধিকার হলো কর্মসংস্থানের দিকে এবং রাজনৈতিক বিষয়টি পছন্দের তালিকার অনেক নিচে।

এর অর্থ হলো সিনিয়র রাজনীতিবিদরা এখনও উদীয়মান জনশক্তির আকাঙ্ক্ষার সাথে নিজেদের খাপ খাওয়াতে পারেননি। এমনকি ২০১৮ সালের নির্বাচনেও আওয়ামী লীগকে ১৯৭১ সালের যুদ্ধের ভুতকে টেনে আনতে হয়েছে, যেখানে আসলে জামায়াতের উপস্থিতিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। নতুন বাস্তবতায় কর্মসংস্থানের বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ যেটাকে সেভাবে উল্লেখই করা হয়নি।

সামাজিক-রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে সহিংতার মাত্রাও কমেনি। কড়া নিরাপত্তার ভোট কেন্দ্রগুলো ‘নিরাপদ’ ছিল কিন্তু নির্বাচনের দিন অন্তত ১৮ জন নিহত হয়েছে। কিন্তু যে ভয়ঙ্কর ঘটনাটি সাধারণ সহিংসতাকে ছাপিয়ে গেছে, সেটা হলো বিএনপিকে ভোট দেয়ার কারণে আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থক কর্তৃক এক নারীকে গণধর্ষণ। এটাকে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে, আরও সড় সমস্যা দেখা দেবে।

এরপর কি?

আওয়ামী লীগ ছাড়া বাকি অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের অবস্থানের উল্লেখযোগ্য অবনতি হয়েছে এবং ভবিষ্যতে নির্বাচন ততটা আকর্ষণীয় হবে না। যে ফল দেখা গেছে, যেখানে আওয়ামী লীগই একমাত্র খেলোয়াড়, এটা জনগণকে উৎসাহিত করবে না। রাস্তাঘাট কিছুকাল নিরাপদ থাকবে, কিন্তু বেকারত্বের হার, বেকার গ্রাজুয়েটের সংখ্যা, দুর্বল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, ক্ষমতাসীন শ্রেণী ও তার মিত্রদের মধ্যে অতিমাত্রায় সুযোগ সুবিধা এবং উপকারভোগীর মাত্রা বাড়তেই থাকবে।

রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনটি প্রধান ইস্যু বিরাজ করবে:

* ক্ষমতাসীন দলের একক-প্রায় ভোট, আসন ও শক্তির বিপরীতে কিভাবে বহুদলীয় রাজনীতিকে ফিরিয়ে আনা যাবে। বিএনপি যেহেতু নির্বাচনী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় পুরোপুরি অক্ষম, তাই তারা কি আবার সড়কে ফিরে যাবে, যেহেতু তাদের আর কোন বিকল্প নেই? এটা কি তাদের জন্য বিকল্প হতে পারে?

* আওয়ামী লীগ কিভাবে তাদের এত এমপিকে খুশি রাখবে, যেখানে আরও অনেকে তাদের সাথে যোগ দেবে। নির্বাচনের আগেই ধারাটা দেখা গেছে এবং ক্ষমতাসীন শ্রেণীর ভেতরে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রতিযোগিতার কারণে এর মাত্রা আরও বাড়বে।

* তরুণ জনগোষ্ঠীর আকাঙ্ক্ষা, প্রত্যাশা ও বিক্ষোভকে কিভাবে মোকাবেলা করা হবে, যেহেতু সামাজিক মাধ্যমের এই ক্ষেত্রটি ক্রমেই বাড়ছে, কোটাবিরোধী ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় যেটা দেখা গেছে? যেহেতু নির্বাচনের পর রাজনৈতিক ক্ষেত্র আরও সঙ্কুচিত হয়ে গেছে, এটা অনিবার্য যে সামাজিক কণ্ঠস্বর রাজনীতির চেয়ে আরও জোরালো হবে আগামীতে। দলীয় সংশ্লেষের বাইরে আন্দোলনগুলো অনেক জোরালো হবে এবং সেগুলো ব্যাপক জনসমর্থনও পাবে, সাম্প্রতিক দুটো আন্দোলনে যেটা দেখা গেছে।

নির্বাচন হয়তো প্রথাগত রাজনীতির একটা সময়ের ক্রান্তিকালের সূচনা করেছে। এখন থেকে নতুন কাঠামোর ঘটনাপ্রবাহ সামনে আসবে যেটা বিজয়ী ও পরাজিত উভয়ের জন্যই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেবে।

আর এইচ

Comments are closed.