rockland bd

দুর্নীতি মামলার আসামি হয়েও রূপালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মনজুর!

0

কে এম রুবেল ফরিদপুর
মনজুর হোসেন। ডেসকোর মালিকানা শেয়ার নিয়ে অনিয়মের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা একটি মামলার আসামি তিনি। ওই অনিয়মের ঘটনায় রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে মোট ১০ কোটি ২০ লাখ ৮৯১ টাকা। মামলাটির বিচার কাজ স্থগিত আছে উচ্চ আদালতের আদেশে। আর মনজুর হোসেন আছেন রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে।
দুর্নীতি মামলার আসামি হয়ে মনজুর হোসেন পর পর দুই মেয়াদে কী করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকে এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আর্থিকখাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধরণের ব্যক্তিকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের চেয়ারম্যান করায় দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে। দুর্নীতি মামলার আসামি হয়েও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা যায় এটি দৃষ্টান্ত হচ্ছে। যা সুশাসনের অন্তরায়। স্থানীয় সরকার সচিব পদে থাকতে সরকারি চাকরি থেকে অবসরে যান মনজুর হোসেন। পরে ২০১৫ সালের ২ এপ্রিল তাকে রূপালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে তিন বছরের নিয়োগ দেয় সরকার। এ বছরের মার্চে মেয়াদ ফুরিয়ে এলে আগামী তিন বছরের জন্য আবারও নিয়োগ পান তিনি। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকুরে মনজুর হোসেন এবার আলোচনা এসেছেন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে। এবার ফরিদপুর-১ (আলফাডাঙ্গা, বোয়ালমারী ও মধুখালী) আসনে নৌকার প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন তিনি। নির্বাচনে অংশ নিতে তিনি সম্পদের বিবরণ দিয়ে হলফনামা জমা দিয়েছে নির্বাচন কমিশনে। সেখানে দুর্নীতি মামলায় আসামি থাকার বিষয়টিও তিনি উলে­খ করেছেন। মামলার নথিপত্র বিশ্লেষণ ও দুদক সূত্রে জানা যায়, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ডেসকোর মালিকানা শেয়ার নিয়ম ভেঙে দুর্নীতি ও অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে ২০০৭ সালের ৮ আগস্ট শাহবাগ থানায় দুর্নীতি দমন কমিশনের তৎকালীন সহকারী পরিচালক মাহবুবুল আলম একটি মামলা করেন। মামলার নম্বর (৭৯/২০০৭)। পরে মামলাটি তদন্তের পর ১৬ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোপত্র জমা দেওয়া হয়। আসামিদের তালিকায় তৎকালীন ডেসা ও ডেসকোর বোর্ড সদস্য এবং বিটিএমসির চেয়ারম্যান মনজুর হোসেনের নাম উঠে আসে। অভিযোগপত্রে বলা হয়, ডেসকো যখন কোম্পানি হয় তখন কর্মকর্তা/কর্মচারী ও ব্যবস্থাপনা পর্ষদের সদস্যদের জন্য আইন করে সংরক্ষিত ৩ লাখ ১৭ হাজার ৭৯৮টি প্রাথমিক শেয়ার থেকে (প্রতিটির ফেসভ্যালু-১০০/-) ৬১ হাজার প্রাথমিক শেয়ার বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিয়েছে। এর মধ্যে মনজুর হোসেনও আছে। সে ২৪০০টি শেয়ার নিজের নামে নিয়েছে। দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত কাউকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি অনৈতিক বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশের ব্যাংকের সাবেক গভর্নর, অর্থনীতিবিদসহ আর্থিক খাত সংশ্লিষ্টরা। জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মালিক তো জনগণ। জনগণ তো একে ভালোভাবে নেওয়ার কথা নয়। বিতর্কিত কাউকে ব্যাংকের মতো স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ না দেওয়াই ভালো ছিল।’ এ ব্যাপারে সাবেক তত্ত¡াবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা অর্থনীতিবিদ ড. আকবর আলি বলেন, ‘দুর্নীতি মামলার আসামিকে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের চেয়ারম্যান করা নৈতিকভাবে ঠিক নয়। এটি অনৈতিক। এটি কোনো ভালো দৃষ্টান্ত নয়।’ জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআইবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও সাবেক ততধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, ‘রূপালী ব্যাংকে কেন এমন বিতর্কিত লোককে চেয়ারম্যান করা হলো আমার মাথায় আসে না। এ সব কারণে ব্যাংকগুলো নানা বিপদে পড়ছে। ঋণখেলাপি বাড়ছে। আইন হোক আর নৈতিকতা হোক, কোনোভাবেই এটা ঠিক হয়নি।’ অভিযোগপত্রে আরও উলে­খ করা হয় যে, ‘বিধি বহির্ভূতভাবে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের ১০০তম বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত নিয়ে ডেসকোর বোর্ডে উপস্থিত খান লোদী সাইফুল ২২৫০টি শেয়ার, মো. মনজুরুল হোসেন ২২৫০টি শেয়ার, মো. মোস্তাফিজুর রহমান ২২৫০টি শেয়ার, সালেহ আহমেদ ২৪৯৮টি শেয়ার, মনজুর হোসেন ২৪০০টি শেয়ার, কুদরত ই খোদা ২৪০০টি শেয়ার, এ এইচ এম নুরুল হুদা ১৭৫০টি শেয়ার সহ মোট ১৫৭৯৮টি শেয়ার নিজেরা নিয়েছেন এবং অবশিষ্ট শেয়ার অন্যদের দিয়েছেন। অর্থাৎ ডেসকোর বোর্ড অব ডিরেক্টররা ডিরেক্ট লিস্টিং রেগুলেশন অনুযায়ী শেয়ার ট্রেডিং এর ব্যবস্থা না নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হওয়ার অসৎ উদ্দেশে ১০০ তম বোর্ড সভার অবতারনা করে তৎকালীন (১৫ জানুয়ারি/০৭) প্রতিটি শেয়অর ৪২৩.২৫টাকা সর্বনিম্ন বাজার মূল্যের জায়গায় ১০০ টাকা অবহিত মূল্যে ১৫৭৮৯টি শেয়ার নিয়েছে এবং বাকিগুলো অন্যদের দিয়েছে। যাতে সরকারের মোট ১০ কোটি ২০ লাখ ৮৯১ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। আদালত সূত্রে জানা যায়, এখন পর্যন্ত মামলাটির বিচারকাজ শুরু হয়নি। উচ্চ আদালতে একের পর এক শুনানির মাধ্যমে মামলার কার্যক্রম স্থগিত করে রাখা হয়েছে।
আর বি

Comments are closed.