rockland bd

বাড়ি ভাড়া বাড়ছেই

0

বাংলা টুডে রিপোর্ট :

কর্মসংস্থানের সিংহভাগ রাজধানী ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় এবং গ্রামে কর্মসংস্থানের অভাব হওয়ায় সাধারণ মানুষ কাজের সন্ধানে রাজধানীমুখী হচ্ছে। এতে রাজধঅনীতে ক্রমান্বয়ে আবাসন সমস্যা তীব্র আকার ধারণ করছে।

কোটি কোটি মানুষের আবাসস্থল রাজধানী ঢাকায় বাড়িভাড়া বাড়ছে ফি বছর। রোজগারের সিংগভাগ টাকা চলে যায় বাড়িওয়ালার পকেটে। বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের তালিকাও মানছে না কেউ। ভাড়াটের সঙ্গে বাড়িওয়ালার চুক্তি দুই বছরের মধ্যে ভাড়া বাড়ানোর নিয়ম না থাকলেও বছর শেষে বাড়ছে বাড়ি ভাড়া। বছরের শুরুতে বাড়িভাড়া বাড়ানোর ব্যাপারে বাড়িওয়ালাদের একচ্ছত্র আধিপত্য দেখে কে বলবে দেশে বাড়িভাড়া আইন আছে? বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণে কোন তদারকির ব্যবস্থা না থাকায় এবং বাড়িওয়ালাদের বাড়িভাড়া বাড়ানোর বাহাদুরি দেখে মনে হয় সরকারের সংশ্লিষ্টরা যেন বাড়িওয়ালাদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে।

ঢাকা নগরী এখন মেগাসিটিতে পরিণত হয়ে উঠেছে। ক্রমান্বয়ে বাড়ছে আবাসনের চাহিদা। সে চাহিদা অনুযায়ী বেড়ে চলছে ভবন নির্মাণ। রাজধানী ঢাকা শহরের সোয়া কোটি অধিবাসীর প্রায় চার ভাগের তিন ভাগ লোকই বসবাস করছে বিভিন্ন ধরনের ভাড়া বাড়িতে। উপার্জনের আশা ও কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ঢাকা নগরীতে আসা অধিবাসীরা একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই নিতে গিয়ে অসহায়ের মতো মেনে নেন বাড়িওয়ালাদের যে কোনো সিদ্ধান্ত। গত ১০ বছরে ঢাকা শহরে বাড়ি ভাড়া বেড়েছে প্রায় দু’শ গুণ। ফলে নগরীতে বসবাসকারী শতকরা ৭০ ভাগ মানুষের আয়ের ৭০ শতাংশের বেশি ব্যয় করতে হয়েছে বাড়ি ভাড়া বাবদ।

শুধু বাড়ি ভাড়াই নয়, বাড়িওয়ালাদের প্রতি ভাড়াটিয়াদের রয়েছে অনেক অভিযোগ। বাড়িওয়ালারা শুধু ভাড়ার টাকা আদায়ের জন্য ব্যস্ত থাকেন। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের প্রতি তাদের অনেকেই নজর রাখেন না। ফলে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়েও দুর্ভোগ পোহাতে হয় অনেককে। আবার অনেক বাড়িতে নেই কেয়ারটেকারসহ পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ফলে প্রায়ই অনেক বাসাতে চুরি-ডাকাতিসহ অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটে থাকে।

ঢাকার প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষই ভাড়াটে। ক্যাবের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাড়িওয়ালাদের ৮০ শতাংশই বাড়িভাড়ার আয় দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন এবং ঢাকার ২৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ বাড়িওয়ালা ভাড়াটেদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। ভাড়াটেরা বাড়িভাড়া আইন সম্পর্কে না জানার কারণে বাড়িওয়ালাদের দ্বারা নির্যাতিত ও নিগৃহীত হওয়া সত্ত্বেও আইনি পদক্ষেপ নিতে পারছেন না।

খিলগাঁও, শাহজাহানপুর, মালিবাগ, রামপুরা, চৌধুরীপাড়া, বাসাবো, গোড়ান ও মোহাম্মদপুর ও মিরপুর এলাকায় বাড়ির মালিকরা ভাড়া বাড়িয়েছেন। কেন এই ভাড়া বৃদ্ধি, তার কোনো সদুত্তর নেই বাড়ির মালিকদের কাছে। বাড়ির মালিকদের বক্তব্য, রড-সিমেন্টসহ নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়েছে। বেড়েছে চাল-ডালসহ অন্যান্য পণ্যের দাম। তাই তারাও ভাড়া বাড়াচ্ছেন। ঢাকার উত্তরা, গুলশান, বনানী, সেগুনবাগিচা ও বেইলি রোডের মতো অভিজাত এলাকায়ও লাগামহীনভাবে বাড়ছে বাড়িভাড়া।

অভিজাত এলাকায় ভাড়া যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে বস্তির খুপড়িঘর, মেস, টিনশেড ঘরের। যেসব এলাকায় ভালো স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, ওইসব এলাকায় ভাড়া বাড়ছে সবচেয়ে বেশি। কেন এই বেসামাল ভাড়া বৃদ্ধি, তার কোনো সদুত্তর নেই কারও কাছে।

ঢাকার ভাড়াটিয়ারা মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রচন্ড মনোকষ্ট নিয়েই আয়ের সিংহভাগ তুলে দিতে বাধ্য হন নাছোরবান্দা বাড়িওয়ালাকে। তার ওপর নানা ছলছুতায় বাসা ভাড়া বাড়ানো এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। আর বাড়িভাড়ার বাড়তি চাপ হজম করতে গিয়ে জীবনের অনেক স্বাদ-আহ্লাদ বাদ দিতে হচ্ছে ভাড়াটেদের।

ভাড়াটেদের সঙ্গে সামন্ততান্ত্রিক আচরণে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন রাজধানীর অধিকাংশ বাড়িওয়ালা। তারা ভাড়াটেদের হয়তো মানুষই মনে করেন না। বাড়ি ভাড়ার পাশাপাশি দারোয়ান ও সিঁড়ি পরিষ্কারকারীর বেতনও ভাড়াটেদের ওপর চালিয়ে দিচ্ছেন কোন কোন বাড়িওয়ালা। অন্যদিকে বাসা ভাড়া বাড়ানোর কারণ হিসেবে বাড়িওয়ালারা মুখস্থ কয়েকটি কারণ দেখান। এগুলোর মধ্যে কর বৃদ্ধি, জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ-গ্যাসের মতো সেবাপণ্যের দাস বৃদ্ধি অন্যতম।

তবে ডিসিসির বক্তব্য হচ্ছে, ‘আগের নিয়মে এখনও মোট ভাড়ার ১২ শতাংশ হারে হোল্ডিং ট্যাক্স আদায় করা হয়। কোনো ধরনের কর বাড়ানো হয়নি দুই যুগেও।’

বাড়িওয়ালা বাড়ি ভাড়া থেকে লাখ লাখ টাকা আয় করলেও সরকার বঞ্চিত হচ্ছে রাজস্ব আয় থেকে। অনেক বাড়ির মালিক বাড়ি নির্মাণ করার পর্যাপ্ত টাকা থাকা সত্ত্বেও ব্যাংক ঋণ নিয়ে বাড়ি বানান। এতে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার কৌশল থেকে যাচ্ছে।

বাড়িভাড়া যে হারে বাড়ছে সে তুলনায় হোল্ডিং ট্যাক্স বাড়েনি। বাড়িওয়ালার একটি বাণিজ্যিক শিল্প প্রতিষ্ঠানের মতো ব্যবহার করে আয় করছেন লাখ লাখ টাকা। কিন্তু সরকারের রাজস্ব খাত সে তুলনায় একেবারে কম। রাজধানীতে বাসা-বাড়ি বা বাণিজ্যিক ভবনের ট্যাক্স নিয়ে রয়েছে বড় ধরনের বৈষম্য।

বাড়িভাড়া নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ১৯৯১ সালে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন নামে একটি আইন করা হয়। এর অধীনে একজন নিয়ন্ত্রকও রয়েছেন। ভাড়াটিয়া ও বাড়িওয়ালা নির্বিশেষে কেউ সেখানে যান না।

আইনের ৭ নং ধারায় বলা হয়েছে, কোনো বাড়ির মালিক মানসম্মত ভাড়ার অধিক বৃদ্ধি করলে ওই অধিক ভাড়া আদায়যোগ্য হবে না। মানসম্মত ভাড়া অপেক্ষা অধিক হারে ভাড়া কোনো অবস্থাতেই আদায় করা যাবে না।

আইনের ১০ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ভাড়া দেয়া বা ভাড়া নবায়ন করা বা ভাড়ার মেয়াদ বৃদ্ধি করার কারণে ভাড়ার অতিরিক্ত কোনো প্রিমিয়াম, সালামি জামানত বা অনুরূপ কোনো অর্থ দাবি বা গ্রহণ করতে বা দেয়ার জন্য বাড়িওয়ালা ভাড়াটিয়াকে বলতে পারবেন না।

আইনের ১৩ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ভাড়াটিয়া কর্তৃক ভাড়া পরিশোধ করা হলে বাড়ির মালিক তাৎক্ষণিক ভাড়া প্রাপ্তির একটি রশিদ বিধি দ্বারা নির্ধারিত ফরমে স্বাক্ষর করে ভাড়াটিয়াকে দেবেন এবং বাড়ির মালিক ভাড়ার রশিদের একটি চেকমুড়ি সংরক্ষণ করবেন। বর্তমানে ঢাকা শহরের বাড়িওয়ালারা এই আইনের কোনো ধারাই মানেন না বলে অভিযোগ করেছেন ভাড়াটিয়ারা।

বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনে ভাড়া নির্ধারণের জন্য বা ভাড়া নিয়ে কোনো জটিলতা দেখা দিলে তা নিরসনের জন্য একজন নিয়ন্ত্রক রাখার বিধান রয়েছে। আইনের বিধান অনুযায়ী ঢাকার সিনিয়র সহকারী জজ নিয়ন্ত্রকের দায়িত্ব পালন করছেন। নিয়ন্ত্রকের ক্ষমতা ও দায়িত্ব সম্পর্কে আইনের ১৫ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, নিয়ন্ত্রক বাড়ির মালিক বা ভাড়াটিয়ার আবেদনের ভিত্তিতে কোনো বাড়ির মানসম্মত ভাড়া নির্ধারণ করবেন এবং এমনভাবে তা নির্ধারণ করবেন যেন এর বার্ষিক পরিমাণ বিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে স্থিরকৃত ওই বাড়ির বাজার মূল্যের শতকরা ১৫ ভাগের সমান হয়।

বাড়িভাড়া প্রসঙ্গে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন ঢাকার ওয়ার্ডগুলোকে তিনটি ক্যাটাগরিতে এলাকাভিত্তিক ভাড়া নির্ধারণ করে ২০০৩ সালে একটি খসড়া নীতি তৈরি করেছিল। ২০০৫ সালে সেটি সংশোধন করা হয়। পরে সেটি আর কার্যকর করা হয়নি।

বাড়িওয়ালা ভাড়াটিয়াকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদের জন্য ভাড়াটিয়াকে ডিফল্টার করতে চেষ্টা চালায়। সেক্ষেত্রে ভাড়াটিয়াকে সতর্কতার সঙ্গে মনে রাখতে হবে, বাড়িওয়ারা কোন কারণে ভাড়া গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে ভাড়াটিয়াকে চুক্তি অনুযায়ী সময়ের মধ্যে অথবা চুক্তি না থাকলে পরবর্তী মাসের ২৫ তারিখের মধ্যে মানি অর্ডারযোগে বাড়িওয়ালার সঠিক ঠিকানায় ভাড়া প্রেরণ করতে হবে। মানি-অর্ডারযোগে প্রেরিত বাড়িভাড়ার টাকাও যদি বাড়িওয়ালা কৌশল হেতু গ্রহণ না করে, তাহলে ওই টাকা ফেরত আসার ১৫ দিনের মধ্যে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রকের আদালতে (সহকারী জজ পদমর্যাদার আদালতে) ক্ষুব্ধ ভাড়াটিয়াকে ভাড়ার টাকা জমা দিয়ে মামলা করতে হবে।

বছরের মাঝামাঝি সময়ে জাতীয় বাজেট ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে একবার এবং বছরের শুরুতে মোট দুবার ভাড়া বাড়ানো এখন বাড়িওয়ালাদের রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। বাড়িভাড়া আইন করার পর ওই দফতরে তেমন কোনো অভিযোগ আসেনি। এ কারণেই মূলত আইন থাকার পরও তা অকার্যকর অবস্থায় পড়ে আছে।

আইন অনুযায়ী একজন নিয়ন্ত্রক প্রস্তুত আছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত ওই নিয়ন্ত্রকের দফতর বাড়িভাড়া নিয়ে ভাড়াটিয়ারা অভিযোগ করেননি। ফলে নিয়ন্ত্রকের পক্ষে তা আর নিজ থেকে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেয়া সম্ভব নয়। কাউকে না কাউকে অভিযোগ করতে হবে।

অনেকেই আইন ও বিধি সম্পর্কে জেনেও নিয়ন্ত্রকের কাছে যেতে চাচ্ছেন না। একদিকে মান-সম্মানের ভয়, অন্যদিকে বাড়িওয়ালা অন্য কোনো অজুহাত দেখিয়ে ভাড়াটিয়াকে উচ্ছেদ করে দেবেন। একটি বাসা ছেড়ে দিলে দেখা যায়, আরও বেশি টাকায় বাড়িওয়ালারা ভাড়া দিয়ে দিচ্ছেন। ভাড়াটিয়াকেও অন্যত্র তার সুবিধামত এলাকায় বাসা ভাড়া নিতে গেলে আরও বেশি ভাড়া গুণতে হয়।

বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন কার্যকর করতে ২০১২ সালের ২৬ এপ্রিল জনস্বার্থে একটি রিট করা হয়। আইন কার্যকরের নির্দেশ কেন দেয়া হবে না, জানতে চেয়ে সরকারের প্রতি কারণ দর্শানোর রুল জারি করেন হাইকোর্ট। এ পর্যন্তই। সরকার স্ব-উদ্যোগে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণে কেন দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছে না, তা বোধগম্য নয়।

বাড়িভাড়া বৃদ্ধি সমাজে অন্যায় ও দুর্নীতিকে উৎসাহিত করবে। যেসব পরিবারকে বাধ্য হয়ে সাবলেট দিতে হচ্ছে, তাদের প্রাইভেসি নষ্ট হচ্ছে। পারিবারিক শান্তি-শৃক্মখলা বিঘ্নিত হওয়ার খেসারত পড়ছে কর্মক্ষমতার ওপর। যার প্রভাব সরাসরি পড়ছে আমাদের জিডিপিতে। বাড়ির মালিকরা কীভাবে ভাড়া বাড়াবেন সেটি একটি নীতিমালায় আসা উচিত। যেহেতু ঢাকা সিটি কর্পোরেশন হোল্ডিং ট্যাক্স আদায় করে, তাদেরই উচিত এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখা। প্রতিটি ওয়ার্ডে এবং বাড়ির সুযোগ-সুবিধা অনুযায়ী বর্গফুট হিসেবে ভাড়া নির্ধারণ করে দেয়া এবং বাড়ানোর বিষয়টিও একটি নীতিমালার মধ্যে থাকা জরুরি।
বাংলাটুডে২৪/আরবি

Comments are closed.