rockland bd

বৃষ্টিতে ভূমিধস আতঙ্কে রোহিঙ্গারা

0

ডেস্ক রিপোর্ট:
বৃষ্টি, ভূমিধস আর ঘূর্ণিঝড়ের মতো বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তারা এখন আদিম মানুষের মতোই অসহায়। শরণার্থী শিবিরে রোহিঙ্গারা নির্ভর করছেন কেবল ভাগ্যের ওপর।

এ সময়ে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবিরের পাশেই পাহাড়। বিষণ্ণ দৃষ্টিতে দেখছিলেন শরণার্থী ওয়াসিউর রহমান মাটির পাহাড়ের একটি জায়গা। সেখানে কিছু দিন আগে ভারী বৃষ্টিতে ভূমিধসে মারা গেছেন এক রোহিঙ্গা নারী। তিনি হয়তো ভাবছিলেন, নিজের এবং তার পরিবারের বেঁচে যাওয়ার সৌভাগ্যের কথা।

৫৩ বছর বয়স্ক ওয়াসিউর বলেন, ‘আমার পরিবারও মারা যেতে পারত। চারপাশে প্রচুর শিশু রয়েছে। আমরা সবসময়ই আতঙ্কে থাকি কখন বৃষ্টির কারণে ভূমিধস হয়!’

পরিবারের ৯ সদস্য নিয়ে ওয়াসিউর মিয়ানমার থেকে জাতিগত নিপীড়নের কারণে পালিয়ে আসার পর পাহাড়ের ঠিক পাশেই বাঁশের মাচা ঘর তৈরি করে থাকছেন।

গত আগস্ট থেকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সহিংস নিপীড়নে ৭ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। কিন্তু এবার বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার আগ থেকেই শুরু হয়েছিল শঙ্কা। আগের শরণার্থী এবং নতুন করে আসা শরণার্থী মিলিয়ে মোট ১০ লাখ শরণার্থী কক্সবাজারের পাহাড়ি ঢালে প্লাস্টিকের বস্তা বা বাঁশের চাটাই দিয়ে ডেরা তৈরি করে থাকছেন।

শরণার্থীদের ভূমিধস থেকে প্রাণে বাঁচানোর তাগিদেই সরকার বিশাল কর্মযজ্ঞ চালাচ্ছে। বুলডোজার দিয়ে সমান করা হচ্ছে বিভিন্ন স্থান, শরণার্থী আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করছে। তার পরও কিছু দিন আগের ভূমিধসে রোহিঙ্গা মেয়েটির মৃত্যু শঙ্কা তৈরি করেছে নতুন করে।

পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসের কারণে প্রাণহানির ঝুঁকিতে থাকা দুই লাখ রোহিঙ্গাকে সরিয়ে নেওয়ার মতো জায়গার অভাব রয়েছে বাংলাদেশে। এখন পর্যন্ত মাত্র ২১ হাজার শরণার্থীকে কিছুটা নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে।

কক্সবাজারে জাতিসংঘ শরণার্থী শিবিরের প্রধান কেভিন জে অ্যালেন বলেন, ভূমিধস বা পাহাড়ি ঢলে সত্যিকার অর্থেই ব্যাপক প্রাণহানির ঝুঁকি রয়েছে। সেক্ষেত্রে এসব শরণার্থী আরেকটি বড় বিপর্যয়ের মধ্যে পড়বেন এবং এবার প্রকৃতির দ্বারা।

ক্যাম্পের অস্থায়ী ঘরগুলোকে জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত আড়াই মিটারের বেশি (আট ফুট) বৃষ্টিপাত সহ্য করতে হবে। মোটামুটি এক বছর ব্রিটেনে, যা বৃষ্টিপাত হয় তার তিনগুণ!
এ ছাড়া ঘূর্ণিঝড়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রচুর ক্ষতি হয়েছে। এ কারণে প্রচুর পদক্ষেপ নিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। বর্ষা মৌসুমে রোহিঙ্গাদের প্রতিকূল অবস্থা থেকে রক্ষা করতে সরকার ও অংশীদার প্রতিষ্ঠানসমূহ আরও বেশ কিছু প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। পাহাড়ের খাড়া অংশগুলোকে সমান করা, আগাম সতর্কবার্তা প্রচার, বর্ষাকালীন রোগব্যাধি সম্পর্কে সচেতন করার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।

পায়খানাগুলো বালির বস্তা দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে, যাতে জলোচ্ছ্বাসে ক্ষতি না হয়। আবার রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকার স্থায়ী আবাসন ব্যবস্থাও করতে পারছে না। প্রথমত সামর্থ্যের অভাব এবং দ্বিতীয়ত এটি স্থায়ীভাবে তাদের এখানে থাকার সুযোগ করে দেবে। ঢাকার পরিকল্পনা হচ্ছে- এই বিপুলসংখ্যক শরণার্থীকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো।

নূর মোহাম্মদ নামে আরেক শরণার্থীর খুপড়িঘরের ছাদ এক সাম্প্রতিক ঝড়ে উড়ে গেছে। তিনি এটা বাঁচানোর চেষ্টায় কাঠ আর পাথর দিয়ে বাড়ির ছাদ ভারী করেছেন। কিন্তু চরম প্রতিকূল আবহাওয়ায় যখন হাওয়া বইবে, তখন এর কার্যকারিতা নিয়ে তার নিজেরই সন্দেহ রয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা রোহিঙ্গারা ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে অপরিচিত নই। মিয়ানমারে আমাদের ঘরগুলো এ ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় প্রতিরোধক হিসেবে তৈরি করা হয়। চারপাশের গাছগুলো একটি শক্ত প্রতিরোধ বা বাধা হিসেবে কাজ করত। এখানে সে রকম আটকানোর কিছুই নেই।

পাহাড়ে উজাড় হয়ে যাওয়া বিস্তৃত বনাঞ্চলের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি এ কথা বলেন। তাদের জন্য বাংলাদেশ হাজার হাজার হেক্টর জমি দিয়েছে, কিন্তু সেটা পাহাড়ে এবং রোহিঙ্গারা এখানে আসার আগেও ভূমিধসে বাংলাদেশে প্রাণহানির ঘটনা বিরল নয়।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক বলেন, মসজিদ ও কমিউনিটি সেন্টারগুলো দুর্যোগকালীন দেড় লাখ লোককে আশ্রয় দিতে পারবে। কিন্তু বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড় আঘাতের শঙ্কা থাকলে এসব শরণার্থীকে অন্যত্র সরিয়ে নিতে হবে, যে ব্যবস্থপনা নেই।

এদিকে নির্যাতনের মুখে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা বাড়ি ফিরতে ভয় পাচ্ছেন। রোহিঙ্গা ইমাম ইউসুফ বলেন, ‘সবাই ভয় পাচ্ছে এটি ভেবে যে, কোথায় যাবে। কেননা আমাদের বাড়ি তো ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে।

সেবা সংস্থাগুলো বলছে- বড় ধরনের যে কোনো ঘূর্ণিঝড় রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের রাস্তা এক সপ্তাহের জন্য বন্ধ করে দিতে পারে। ফলে খাবার ও অন্যান্য সরবরাহ বন্ধ থাকবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকোর সমান বিপুল জনসংখ্যার রোহিঙ্গা গোষ্ঠী সত্যি তখন ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে সম্মুখীন হবে।
অবশ্য সে রকম অবস্থা তৈরি হলে খাদ্যবহনকারী কয়েক হাজার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেবাকর্মী প্রস্তুত রয়েছে বলে বিশ্ব খাদ্য সংস্থার জরুরি বিভাগের সমন্বয়ক পিটার গেস্ট জানিয়েছেন।

কেননা, এ ধরনের পরিস্থিতিতে তাদের কোথাও পালানোর বা যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, বাংলাদেশের নিরাপত্তাপত্তা বাহিনীর কড়া নজরদারিতে রয়েছেন তারা। নিজেদের অসহাত্বের কথা ৭০ বছের বৃদ্ধ শরণার্থী দিল মোহাম্মদের সুরেই সবচেয়ে করুণভাবে এলো, আল্লাহ সহায়তা না করলে আমরা আর কী বা করতে পারি!

সূত্র: ডয়চে ভেলে

বাংলাটুডে/আর এইচ

Comments are closed.