rockland bd

সংলাপের শতরং

0

দলের সেরা খেলোয়াড়টি ৯০ মিনিটের মাথায় দলের হয়ে তার হেট্রিক পূর্ণ করলেন। এরপর বলটা প্রতিপক্ষ দলের অধিনায়কের কাছে দিয়ে বললেন, এবার তোমরা যত ইচ্ছা খেলো। অতি আশাবাদীরা বলবেন, অতিরিক্ত দুই থেকে পাঁচ মিনিটে যেকোন কিছুই হতে পারে। তা হয়তো পারে।
তবে সে ক্ষেত্রেও জেতার সম্ভাবনা থাকে কম। পহেলা নভেম্বর গণভবনে সংলাপ শুরু হলো সরকার ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মধ্যে দিয়ে।
আপনি ফুটবলের পাড়ভক্ত হলে, একে এভাবেই মূল্যায়ন করতে পারেন। আবার একমত নাও হতে পারেন।
দেশে এক-এগারোর মতো সরকার আর আসবে না। এক এগারো তারিখে বিরোধীদের সাথে সংলাপ শুরু করে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জাতিকে হয়তো এ বার্তায় দিলেন।
এই সংলাপে সরকার ও আওয়ামী লীগ প্রত্যাশার চেয়েও বেশি কিছু পাচ্ছে। বিরোধী দল বিএনপি রাজনৈতিক মাঠে যে কার্যত শিশু, তারা তা আরো একবার প্রমাণ দিলো।
টানা বার বছর ক্ষমতার বাইরে দলটি। কার্যত নেতৃত্ব শূন্য ও দিকভ্রান্ত— অবস্থা দলের ভিতর ও বাইরে।
এখন দলে যারা নীতিনির্ধারণীতে আছেন, তাদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা নিয়ে আপনি প্রশ্ন তুলতেই পারেন। কেন?
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গণমাধ্যমে স্পষ্ট করেই বলেছেন, বিএনপির সাথে কোন সংলাপ নয়। বাস্তবে টেকনিকেলি দলটি তা করেছে।
তারা সংলাপ করেছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সাথে। বিএনপি সেখানে ঐক্যফ্রন্টের প্রতিনিধি দলের সদস্য হয়ে গণভবনে সংলাপে অংশ নিয়েছে।
একে বলে, এক ঢিলে দুই পাখি মারা। বিএনপির সাথে সংলাপও হলো আবার তাদের সাথে সংলাপ হলো না। চলমান সংলাপের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন দলটি আসলে, এক ঢিলে সব পাখি মারতে চাইছেন।
তারা সফল বলতেই হবে। সংলাপ সফলভাবে সম্পন্ন করে বিরোধীদের আন্দোলনে যাওয়ার পথকে কার্যত রুদ্ধ করে দিলো আওয়ামী লীগ। এখন আন্দোলনে যেতে শতবার ভাবতে হবে বিরোধী দলকে ।
জাতির সামনে তারা কী ব্যাখ্যা দেবেন? সরকার তাদের কোন কথাই শুনছে না? অবশ্য সরকার তার কোন কথাই রাখছেন না, বলার সুযোগ তাদের কাছে থাকছেই।
তার আগে ঐক্যফ্রন্টের সাত দফা দাবি কতটা অযোক্তিক, এর ব্যাখ্যাই প্রধানমন্ত্রী এবং তার ও তার শরিক দলের নেতাদের কাছ থেকে যে ছবক তারা শুনে আসলেন তা হজম করতে হবে।
সাত দফ দাবির প্রথম দফা- খালেদা জিয়ার মুক্তি। এটা আদালতের বিষয়। দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফা- জাতীয় সংসদ বাতিল ও নিরপেক্ষ সরকার। সংবিধান পরিপন্থী।
চতুর্থ দফা- ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসহ সেনা বাহিনী মোতায়ন। এমন কোন পরিস্থিতি তৈরী হয়নি, যাতে এর দরকার আছে। পঞ্চম দফা- ইভিএম ব্যবহার না করা। স্বপ্ল পরিসরে তা ব্যবহৃত হবে। সরকার কিন্তু বলেনি, ১০০ টি আসনে তা ব্যবহৃত হবে না।
ষষ্ঠ দফা- পর্যবেক্ষক নিয়োগ। এটাতে সরকারের সম্মতি আছে। সপ্তম দফা- রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার। প্রধানমন্ত্রী মামলার তালিকা চেয়েছেন ও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তিনি দেখবেন। সব সমস্যার সমাধান।
ফলে সংলাপ শেষে ড. কামাল হোসেনের বাসায় অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের মাঝে চরম মতপার্থক্য দেখা গেছে। ড. কামাল বললেন, সংলাপ ভালো হয়েছে। বিএনপির মহাসচিব বললেন, তিনি সন্তুষ্ট না।
পাশ থেকে ছোট দলের বড় এক নেতা মির্জা ফকরুল ইসলামকে বিরক্তির সুরে বললেন, পারলে আন্দোলন করে দেখান। বিএনপির এমন দৈন্যদশা ভাবা যায়!
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ যে বারবার বলে, বিএনপির আন্দোলন করার মুরোদ নেই। এ সত্য ছোট দলগুলোও জেনে গেছে! আসলে দেশের অন্যতম বড় দলটি খেই হারিয়ে ফেলেছে।
এই দূর্বলতার সুযোগ সরকার নিচ্ছে। তারা সংলাপে বিরোধী পক্ষকে রাজনৈতিকভাবে ঘায়েল করার নীতি গ্রহণ করেছে। রাজনীতির কূট চালে সাময়িকভাবে জিততে চাচ্ছে।
মনে রাখা ভালো, রাজনৈতিক ডিবেটে চরমভাবে পারদর্শী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
তাই এই সরাসরি সংলাপে তাঁর কাছ থেকে জিতে আসা অন্যদের কঠিন হবে। এরই মধ্যে ঐক্যফ্রন্ট রাজনীতিতে অনাড়ি, তারা তা প্রমান করে এসেছে।
আরেক জোট যুক্তফ্রন্টের সুর নরম আছে। তাদের প্রধান দাবি মনে হয়, একাদশ সংসদে তাদের যুবরাজকে এমপি হিসেবে দেখতে পাওয়া। তথাকথিত গৃহপালিত বিরোধী দল সরকারের পকেটেই আছে।
তারা সংলাপে আসান ভাগাভাগি নিয়ে দর কষাকষি করবে। বামরা সুন্দর-সুন্দর কথা বলবেন। ফলে বড় ধরণের কোন হুমকি আপাতত সরকারে সামনে আছে বলে মনে হচ্ছে না।
সংলাপ শুরুর আগে খাবার মেনু নিয়ে অনেক আলোচনা ছিলো। প্রধানমন্ত্রী তাঁর চাচাসম ড. কামাল হোসেনের পচ্ছন্দের খাবার পরিবেশন করতে চাইলেন।
সংলাপ শুরুর প্রাককালে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অনেকে ভেবেছিলেন, ঐক্যফ্রন্ট সংলাপে নির্বাচন পেছানোর দাবি করবে। তারা সংবিধানের ১২৩ ধারার ৩(খ) উপ-ধারার সুযোগ নিতে চাইবে।
অর্থাৎ সংসদ ভেঙ্গে যাবার পরবর্তী নব্বই দিনের মধ্যে নির্বাচন। এতে বর্তমান দশম সংসদের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবার পর, নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতো।
বিরোধী দলগুলোর সংবিধানের মধ্যেই একটা ভ্যাকুয়াম পেতে পারতো। এক্ষেত্রে কোন ব্যাখ্যার আবশ্যকতা থাকলে ড. কামাল হোসেন ও প্রধানমন্ত্রী দুজনেইতো সংলাপে উপস্থিত ছিলেন।
এই দাবিটা ঐক্যফ্রন্ট প্রধান দাবি হিসেবে উপস্থাপন না করাই অনেকেই বিষ্মিত হয়েছেন। অনেকে বলছেন, ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের সথেষ্ঠ হোমওয়ার্কের অভাব আছে। যদিও এখন তারা তফসিল ঘোষণা পিছানো ও আবার সংলাপের কথা বলছেন।
একদিনের সংলাপই শেষ কথা নয়। নিকট ভবিষ্যতে আরও সংলাপ হবে। এমন ইঙ্গিত সংলাপ শেষে পাওয়া গেছে। সংলাপ-সংলাপ খেলায় রাজনৈতিক খেলা জমে উঠবে। নির্বাচন নিয়ে এখনও পর্যন্ত যেসব অনিশ্চয়তা আছে, তা কেটে যাবে।
এমনাটা আশা করছেন সাধারণ মানুষ। তবে ইতিহাস ভিন্ন কথা বলে। বাংলাদেশে সংলাপের মাধ্যমে কোন সমস্যার সমাধান হয়নি।
রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান, রাজনীতির মাঠেই হয়েছে। লক্ষ্য করলে দেখবেন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সবসময় সবকিছুকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলার কথা বলে।
আসলে সরকারের স্ট্রেটিজি হলো, মাঝমাঠে ও নিজেদের কোর্টে বল দখল রেখে প্রতিপক্ষকে দূর্বল ও ছন্নছাড়া করে ফেলা। আর সুযোগ বুঝে উপরে উঠে গোল দিয়ে ফেলা। সরকার স্বপ্রণোদিত হয়ে দেশের সব রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সংলাপে করছেন। বিদেশীরা সংলাপ-সমঝোতা নিয়ে জোর গলায় কথা বলার সুযোগ কম পাবে এবার। যা বলার বর্তমান সরকারকেই বলতে হবে।
সরকার বলেই দিয়েছে, তারা সংবিধানের বাইরে একচুলও যাবে না। সেক্ষেত্রে দাবি আদায়ের জন্য বিরোধী দলকে ক্ষেত্র তৈরী করতে হবে।
যা নিকট রাজনৈতিক সংঘাতের ঈঙ্গিত দেয়। কী হবে তা হয়তো সময়ই বলে দেবে। আপাতত ক্ষমতাসীন সরকার সন্তুষ্টির ঢেকুর তুলতেই পারেন। রাজনীতির বল এখন তাদের পায়ে ও কোর্টে।
রাজনীতির এই খেলা চলতেই থাকবে। সংলাপ হবে। সফল বা বিফল যে কোনটার একটা হবে। পাঁচ বছর পরপর নির্বাচন আয়োজন করা হবে। যেকোন একটা জোট ক্ষমতায় যাবে। কিন্তু নির্বাচন এলেই যে সংশয় ও ভয় তা দূর হবে কবে? আমাদের রাজনীতিবীদদের পরস্পরের প্রতি যে আস্থাহীনতা তা কাটবে কবে?
দেশে প্রকৃত গণতন্ত্রের সুবাতাস বইবে কবে? এরকম হাজারও প্রশ্নের উত্তর সাধারণ জনগণ পেতে চায়। এবারের সংলাপের মধ্য দিয়ে, দেশের সব রাজনৈতিক সংকট দূর হবে। নির্বাচনী ব্যবস্থার একটা স্থায়ী সমাধান আসবে। এমনটাই সাধারণ জনগণের প্রত্যাশা। আর অবাদ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বচন করার দায় সরকার কোনভাবেই এড়াতে পারে না।

Comments are closed.