rockland bd

অর্থপাচারের দায়ে ১৩২টি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দ

0

বাংলাটুডে২৪ ডেস্ক । ১৪ নভেম্বর ২০১৬,সোমবার
বিভিন্ন দেশে প্রায় ৪১৬ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ১৩২ প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। বাতিল করা হয়েছে এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার লাইসেন্সও।
সম্প্রতি এনবিআর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক প্রতিবেদন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
এনবিআরের প্রতিবেদনে পর্যায়ক্রমে ১৩২টি প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের পাচার করা অর্থের পরিমাণ, ব্যবসায়ের লাইসেন্স নম্বর ও আওতাধীন সার্কেলের নামও তুলে ধরা হয়েছে।
আজ সোমবার দৈনিক কালের কণ্ঠে এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠান ৪১৫ কোটি ৯৩ লাখ ৬৬ হাজার ৩০২ টাকা ব্যাংকিং চ্যানেলে পাচার করেছে। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির নামে সবচেয়ে বেশি অর্থপাচার হয়েছে। এরপর বিভিন্ন ধরনের কাঁচামাল আমদানি, উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে বিশেষজ্ঞ আনা, বিদেশে সেমিনার আয়োজনের নামেও অর্থপাচার হয়েছে। আমদানি ও বিপণন খাতে নতুন ক্রেতা খুঁজতেও মোটা অর্থ পাচার করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান বা পরিচালকরা বিদেশ ভ্রমণের ব্যয়ও নিজস্ব ব্যাংকিং চ্যানেলে পাঠিয়েছেন। এসব ক্ষেত্রে কারখানার রেজিস্টারে যে হিসাব উল্লেখ আছে তা বাজারে প্রচলিত হিসাবের বহু গুণ বেশি। প্রতিষ্ঠানগুলো দফায় দফায় এই অর্থ পাচার করেছে। আর সবচেয়ে বেশি অর্থপাচার হয়েছে তাইওয়ান, চীন, ভিয়েতনাম, কোরিয়া, ভারত, থাইল্যান্ড, দুবাই, মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস, বুলগেরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, লিথুয়ানিয়া, পোল্যান্ড, বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো প্রতিবেদনে অর্থপাচারে সহায়তাকারী ও জড়িতদের অধিকতর তদন্তের মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করে প্রচলিত আইনে বিচারের সুপারিশ করেছে এনবিআর।
বলা হয়েছে, অনেক ব্যাংকের অসাধু কর্মকর্তা এবং শুল্ক শাখার অসাধু কর্মকর্তারা এই ১৩২ প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশকেই অর্থপাচারে সহায়তা করেছেন মর্মে যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। বিনিময়ে তারা ওই সব প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থসহ বিভিন্ন অনৈতিক সুবিধা পেয়েছেন।
অর্থপাচার-সংক্রান্ত তদন্ত পরিচালনায় এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা শাখা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি), শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর, মূসক (মূল্য সংযোজন কর) বা ভ্যাট (ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স) মূল্যায়ন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর, ট্রান্সফার প্রাইসিং সেল এবং ট্যাক্সেস অ্যান্ড লিগ্যাল এনফোর্সমেন্ট শাখার কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে ২১ সদস্যের টাস্কফোর্স কমিটি গঠন করা হয়।
এই কমিটি প্রায় এক বছর ধরে কারখানা, ব্যাংক, বন্দর, বন্ডেড ওয়্যারহাউসসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সরেজমিনে পরিদর্শনে তথ্য-প্রমাণ জোগাড় করে যাচাই-বাছাই করে অর্থপাচারের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে।
গত ৭ জুলাই টাস্কফোর্স কমিটি এনবিআর চেয়ারম্যান মো. নজিবুর রহমানের কাছে এ প্রতিবেদন জমা দিয়ে অর্থপাচারকারী ১৩২ প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দের সুপারিশ করে। এনবিআর চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং আইন মন্ত্রণালয়ে এসব প্রতিষ্ঠানের হিসাব জব্দের বিষয়ে মতামত চায়।
প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর ও অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে হিসাব জব্দের নির্দেশ দেওয়া হয়। আইন মন্ত্রণালয় থেকে আইনি কোনো বাধা নেই বলেও মতামত দেওয়া হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে ১৩২ প্রতিষ্ঠানের হিসাব জব্দ শেষে গত ১০ অক্টোবর টাস্কফোর্স কমিটি এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়।
এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, অর্থপাচারকারী প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করে পর্যায়ক্রমে হিসাব জব্দ ও ব্যবসার লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে মামলা করা হচ্ছে। অর্থপাচারকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে কে বা কারা এতে জড়িত তা চিহ্নিতকরণে কাজ চলছে। এ বিষয়ে সরকারের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।
এনবিআরের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দুই কোটি ২৪ লাখ ৭৭ হাজার ৬১৫ টাকা অনিয়মের অভিযোগে খান অ্যাপারেলস লিমিটেড ও এক কোটি ৪৩ লাখ ৪৬ হাজার ৩১৮ টাকা অনিয়মের দায়ে এবি প্যাকেজিংয়ের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। একইভাবে এক কোটি ৪৭ লাখ ৯০ হাজার ৫৩২ টাকা অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় লুনা অ্যাপারেলস লিমিটেড, দুই কোটি ৬৪ লাখ ৬৭ হাজার ৪৫৫ টাকার হিসাব না পাওয়ায় ম্যাজিটিক অ্যাপারেল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, তিন কোটি ৭১ লাখ ৬৪ হাজার ৭৮০ টাকার অনিয়মের দায়ে উইনওয়্যার লিমিটেড এবং ছয় কোটি ৮৮ লাখ ১৪ হাজার ১২১ টাকা অনিয়মের কারণে এন গার্মেন্টস লিমিটেডের হিসাব জব্দ করা হয়। এ ছাড়া ওয়েল্ড ড্রেসেস লিমিটেড (পাঁচ কোটি ৫৭ লাখ ৭৫ হাজার ৭৯১ টাকা), ইউনিটেক ফ্যাশন লিমিটেড (দুই কোটি ৯৫ লাখ ৮৮ হাজার ৫১৬ টাকা), টাজ ফিউচার ডিজাইন লিমিটেড (পাঁচ কোটি ৮১ লাখ ১২ হাজার ৪৮০ টাকা), অ্যাকিউরেট প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড (এক কোটি ৭১ লাখ ছয় হাজার ২৫৬ টাকা) ও অ্যাসিভ এক্সেসরিজ লিমিটেডের বিরুদ্ধে (তিন কোটি ৫৫ লাখ ৫০ হাজার ৬০২ টাকা) অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে হিসাব জব্দ হওয়া মোট ১৩২ প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন তথ্য এভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাচারে জড়িত ১৩২ প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ও পরিচালকদের আয়-ব্যয়, সম্পদের হিসাবসংক্রান্ত তথ্য এনবিআরের ২১ সদসের টাস্কফোর্স কমিটি খতিয়ে দেখছে। সংশ্লিষ্টরা অর্থপাচারে জড়িত কি না তাও যাচাই করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিসাব জব্দ হওয়া ১৩২ প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশের চেয়ারম্যান ও পরিচালকরা সমাজের প্রভাবশালী। তাঁরা নিজের মালিকানায় এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। তাদের স্ত্রী, সন্তান বা পরিবারের সদস্যরা এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে আছে। এভাবে অর্থপাচাকারী প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশেরই মালিকানায় একই পরিবারের সদস্যরা রয়েছে। তবে অনেকে স্ত্রী ও সন্তানদের নামে প্রতিষ্ঠান গড়ে নিজে মালিকানার বাইরে থেকে সেসব প্রতিষ্ঠানের সব কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করেন। এভাবে বড় অঙ্কের অর্থ পাচার করলেও নিজে থাকছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। এ ছাড়া অর্থপাচারকারী প্রতিষ্ঠানের অনেকে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। অনেকে সরাসরি জড়িত না হলেও যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে তাদের নীতিনির্ধারকদের অনেকের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে চলেন। এতে ব্যাংক, আমদানি-রপ্তানিসংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, এনবিআরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সুবিধা সহজে পেয়েছেন। তবে বিস্তারিত তদন্তে এসব পাচারকারীকে তথ্য-প্রমাণসহ আটক করা সম্ভব হবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো টাস্কফোর্সের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরেজমিন তদন্তে দেখা গেছে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির নামে এলসি খুলে অর্থ পাঠানো হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে মূলধনী যন্ত্রপাতির কার্টন বা খোলা যন্ত্রপাতি বন্দরে দীর্ঘ সময় পড়ে থাকলেও তা আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান গ্রহণ করেনি। বরং আবারও একই প্রতিষ্ঠান যন্ত্রপাতি আমদানির নামে এলসি খুলে অর্থ পাঠিয়েছে এবং তা একইভাবে বন্দরে ফেলে রাখা হয়েছে। আবার বেশি দামের যন্ত্রপাতি আমদানির কথা বলে অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যাংকিং চ্যানেলে এলসি খুলে বিক্রয় প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে অর্থ পাঠিয়ে অনেক কম দামের যন্ত্রপাতি এনে কারখানায় ব্যবহার করছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থপাচারকারী ১৩২ প্রতিষ্ঠানই শতভাগ রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানের তালিকাভুক্ত। এগুলোর অধিকাংশই শুল্ক পরিশোধ না করে বন্ডেড সুবিধার আওতার কাঁচামাল আমদানির সরকারি সুবিধা পায়। অনেকে বন্ড সুবিধা না পেলেও বিশেষ সুবিধা পায়। এই বিশেষ সুবিধার আওতায় পণ্য আমদানিতে শুল্ক খাতে যে অর্থ ব্যয় করে পণ্য আমদানি করে তা পরবর্তী সময়ে ফেরত পায়। এভাবে ১৩২ প্রতিষ্ঠানই সরকারি সুবিধা পেয়েও অর্থ পাচার করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই তৈরি পোশাক খাতের। তবে ওষুধ, প্লাস্টিক, চামড়া ও তৈরি পোশাক খাতের সহযোগী প্রতিষ্ঠানও রয়েছে।
দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি আব্দুল মাতলুব আহমাদ অর্থপাচারকারী প্রতিষ্ঠান চিহ্নিতকরণে এনবিআরের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, অর্থপাচারকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে পারলে অন্যরা ভয়ে এই পথে আসবে না। এফবিসিসিআই এ বিষয়ে এনবিআরসহ সরকারি সব প্রতিষ্ঠানকে সহযোগিতা করবে।
বাংলাদেশ রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি, বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ও এনভয় গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুস সালাম মুর্শেদি বলেন, ‘অসাধু দু-চারজন ব্যবসায়ী নামধারীর জন্য দেশের সব ব্যবসায়ীকে দোষী করা উচিত হবে না। অর্থপাচারকারী চিহ্নিতকরণে ব্যবসায়ী সংগঠন থেকে আমরা একজোট হয়েছি। সরকারকে এ বিষয়ে সব ধরনের সহযোগিতা করতে চাই। তবে এটাও সত্য, অর্থপাচারের জন্য শুধু ব্যবসায়ীদের দায়ী করা ঠিক হবে না। কারণ ব্যাংকিং চ্যানেলে একা একটি প্রতিষ্ঠানের অর্থ পাচার করা সম্ভব নয়। এনবিআর ও ব্যাংকের অসাধু কিছু কর্মকর্তা নিজেদের পকেট ভারী করতে এই অন্যায় করার সুযোগ তৈরি করে দেয়। তাদেরও চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা উচিত।’

Comments are closed.