rockland bd

শূন্য থেকে কোটিপতি, পুঁজি ছাত্রলীগের রাজনীতি

0

লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জ থানা ছাত্রলীগের আহবায়ক কাজী মামুনুর রশিদ বাবলু

জেলা প্রতিনিধি, লক্ষ্মীপুর (বাংলাটুডে) : লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জ থানা ছাত্রলীগের আহবায়ক কাজী মামুনুর রশিদ বাবলুকে ডাকাতির প্রস্তুতি মামলায় গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার (২৪ জানুয়ারি) দুপুরে তাকে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হয়। গতকাল বুধবার সদর হাসপাতাল এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ।
মামলা সুত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালের ২৬ শে আগস্ট সদর উপজেলার কুশাখালি ইউনিয়নের ঝাউডগি গ্রামের মোসলেহ উদ্দিনের বাগানে অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত কাজী বাবলুসহ একদল ডাকাত ডাকাতির প্রস্তুতি নিচ্ছিল। গোপন তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। কিন্তু পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে ডাকাতরা পালিয়ে যায়। পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে বাকি ওরফে বাইক্কা ও আহমদ উল্লাহ শিপনকে অস্ত্রসহ আটক করে। পরে তাদের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে ছাত্রলীগ নেতা কাজী বাবলুসহ ১০/১২ জনের বিরুদ্ধে ডাকাতির প্রস্তুতি মামলা দায়ের করে পুলিশ। ওই মামলায় তাকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে।
কে এই বাবলু?
লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জের ছাত্রলীগের আহবায়ক কাজী মামুনুর রশিদ বাবলু। ছাত্রলীগের পদকে পুঁজি করে কোটি টাকার মালিক তিনি। ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্রকে তোয়াক্কা না করে ৩৫ বছরের কাজী বাবলুকে চন্দ্রগঞ্জ থানার আহবায়ক করা হয় ২০১৮ সালের জুলাই মাসে । তার আগে দুই দুইবার বিদ্যালয়ের গন্ডি না পেরানো বাবলু হন চন্দ্রগঞ্জ থানা ছাত্রলীগের যুগ্ন-আহবায়ক।
ছাত্রলীগ নেতা হয়ে তিনি চন্দ্রগঞ্জ বাজারের ইজারা নেন নিজ নামে। তিনি ইজারা নিয়ে বাজারের ক্ষুদ্র ব্যাবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে নিজের ইচ্ছামত আদায় করেন ইজারার টাকা। কোন ব্যবসায়ী কোন হাটবারে না আসলেও পরবর্তী হাটে আসলে তাকে আগের হাটের ইজারার টাকা দিতে বাধ্য করা হয়। হাট বারে টাকা নেওয়ার নিয়ম থাকলেও তিনি ক্ষুদ্র বাবসসায়ীদের কাছ থেকে হাট বার ছাড়াও মাসিক হারে টাকা আদায় করেন।
কাজী বাবলুর চাঁদাবাজী পরিচালনা করার জন্য রয়েছে ১২ সদস্যের স্ট্যায়ারিং কমিটি। যাদের তিনি মাসিক দশ হাজার করে বেতন দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তার স্ট্যায়ারিং কমিটির সদস্যারা হলেন মোঃ মাসুদ সভাপতি চন্দ্রগঞ্জ কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি, শাকিল সহ-সভাপতি কলেজ ছাত্রলীগ, সেলিম, রুবেল সিএনজির লাইনম্যান, নিশান সহ-সভাপতি কলেজ ছাত্রলীগ,হৃদয় ২নং ওয়াড ছাত্রলীগ চন্দ্রগঞ্জ ইউনিয়ন, জাহাঙ্গীর আহবায়ক তরুন লীগ চন্দ্রগঞ্জ ইউনিয়ন, সজিব, সাজু, রুবেল, ফজলে রাব্বি, আজগর। যারা তার সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কাজী মামুনুর রশিদ বাবলু বিদ্যালয়ের গন্ডি পার হননি। তবুও তিনি ছাত্রলীগ নেতা। প্রায় একযুগ নানা কৌশলে ছাত্রলীগের পদবী হাতিয়ে গড়ে তুলেছেন সন্ত্রাসী বাহিনী ও অঢেল সম্পদ। এলাকাবাসী ছাড়াও তার অপর্কম নির্যাতন ও হামলা থেকে রক্ষা পাচ্ছেন না আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা কর্মীরা। এর আগেও কাজী বাবলুর বিরুদ্ধে ডাকাতি ও অস্ত্রের পৃথক মামলায় চার্জ গঠন করা হলেও বেপরোয়া ছিলেন তিনি ও তার বাহিনীর সদস্যরা।
বাবলু চন্দ্রগঞ্জ ইউনিয়নের দেওপাড়া গ্রামের মো. সিরাজের ছেলে ও র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত লক্ষ্মীপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী ডাকাত নাছির বাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড। তিনি প্রায় এক যুগ ধরে স্থানীয় ছাত্রলীগের বিভিন্ন কমিটিতে পদধারীও ছিলেন।
জানা গেছে, ২০১২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে ডাকাতির চেষ্টাকালে ডাকাত নাছির ও তার সেকেন্ড ইন কমান্ড কাজী মামুনুর রশিদসহ ১০ ডাকাতকে আটক করে র‌্যাব-৭। ওই সময় তাদের কাছ থেকে ম্যাগজিনসহ পিস্তল, বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, গুলি, ডাকাতির সরঞ্জাম ও একটি মাইক্রোবাস উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১২ সালে র‌্যাব-৭ এর ডিএডি মো. নেছার উদ্দিন বাদী হয়ে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় কাজী বাবলুকে দ্বিতীয় আসামী করে গ্রেফতারকৃত ১০জনের নামে ডাকাতি ও অস্ত্র আইনে দুইটি মামলা (জিআর ৫৪৩/১২ ও ৫৪৪/১২) দায়ের করেন। এরপর মামলা তদন্ত শেষে পুলিশ কাজী মামুনুর রশিদ বাবলুকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগ পত্র দাখিল করেন। বর্তমানে মামলা দুটি বিচারাধীন রয়েছে।
ওই মামলায় জামিনে এসে টাকার বিনিময়ে ও নানা কৌশলে ছাত্রলীগের পদ বাগিয়ে নিয়ে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে বাবলু। তার সন্ত্রাসী বাহিনীর কাছে জীম্মি হয়ে যায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও। তার বাহিনীর হয়ে কাজ না করায় স্থানীয় যুবলীগ নেতা রুবেল, রিয়াজ, অন্তর ও রাজুসহ বেশ কয়েকজনের উপর হামলা ও তাদের বাড়িঘর ভাঙচুর করে বাবলু ও তার বাহিনীর সদস্যরা। তাদেরকে বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি দিয়ে এলাকা ছাড়া করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও ব্যবসায়ীরা জানান, চন্দ্রগঞ্জ বাজারের ফুটপাতের দুই শতাধিক দোকান, সিএনজি অটোরিক্সা ষ্ট্যান্ড, বাস ষ্ট্যান্ড থেকে প্রতি মাসে কয়েক লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বাবলু ও তার বাহিনী। এছাড়াও চন্দ্রগঞ্জ বাজারে তার জেনারেটর সংযোগ না নিলেও ব্যবসায়ীদেরকে চাঁদা দিতে বাধ্য করা, হামলার হুমকি দিয়ে বিভিন্ন কোম্পানীর পানির বোতল ও ঝাড় বন্ধ করে নিজেই পানির ব্যবসা এককভাবে নিয়ন্ত্রণ, চন্দ্রগঞ্জ বাজারের দোকানঘর ও চন্দ্রগঞ্জ এলাকায় জমি জমা বিক্রি করতে হলে তাকে চাঁদা দেয়া বাধ্যতামূলক বলেও অভিযোগ করেন তারা।
স্থানীয়রা জানায়, একসময় কাজী বাবলুর পরিবারে নুন আনতে পান্তা ফুরাতো। তার বাবা সিরাজ কাজী গ্রামের ফুট-পাতে বসে নারিকেল-সুপারি ক্রয়-বিক্রয় করতো। অথচ ছাত্রলীগের সাইনবোর্ড ব্যবহার করে মাদক, ডাকাতিসহ সন্ত্রাসী চাঁদাবাজি দখলবাজী করে বাবলু এখন কোটিপতি। নিজ বাড়ীতে গড়ে তুলেছেন ৪তলা ভবন। চন্দ্রগঞ্জ নিউ র্মাকেট কয়েকমাস আগে কাজী মাকছুদুর রহমান স্বপনের কাছ থেকে ৩০ লাখ টাকা দিয়ে একটি দোকান নিজ নামে ক্রয় করেন। তার আগে ৩০ লাখ টাকা দিয়ে অন্য আরেক জনের কাছ থেকেও আরেকাট দোকান ক্রয় করেন। তার ও তার নিকট আত্মীয়দের নামে গড়েছেন সম্পদ। বিভিন্ন ব্যাংকে তার একাউন্টে রয়েছে লাখ লাখ টাকা। অভিযোগ রয়েছে, ডাকাতি ও অস্ত্র মামলার প্রধান আসামী ডাকাত নাছির বাহিনীর প্রধান মো. নাছির বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার পর তার ব্যবহৃত অস্ত্র-শস্ত্র গুলো ও বাহিনীর হাল ধরেন কাজী মামুনুর রশিদ বাবলু।
চন্দ্রগঞ্জ থানা ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক আবু তালেব বলেন, গত রবিবার (২০ জানুয়ারি) রাতে চন্দ্রগঞ্জ থানা ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক রিয়াজ হোসেন জয়ের উপর হামলা চালায় কাজী বাবলু ও তার লোকজন। হামলার ঘটনায় চন্দ্রগঞ্জ থানায় মামলা করায় রিয়াজের বাড়িঘর ও আসবাবপত্র ভাঙচুর করে তারা। চন্দ্রগঞ্জ থানা ছাত্রলীগের নেতৃত্বে অছাত্র ও বয়স্কদের দায়িত্ব না দেওয়ার জন্য প্রতিবাদ করায় এর আগেও রিয়াজের উপর একাধিকবার হামলা করা হয়।
সর্বশেষ মঙ্গলবার (২২ জানুয়ারি) রাতে ছাত্রলীগ কর্মী নাদিম মাহমুদ অন্তরকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে আহত করে, ছাত্রলীগ নেতা রিয়াজকে ফাঁসানোর ষড়যন্ত্র করে কাজী বাবলু ও তার অনুসারীরা। অন্তরকে হাসপাতালে দেখতে যাওয়ার পথে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তরের বাবা, মা ও ছোট ভাইসহ ৬ স্বজন নিহত হয়।
চন্দ্রগঞ্জ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি নুরুল আমিন বলেন, ছাত্রলীগের সাইনবোর্ড ব্যবহার করে চন্দ্রগঞ্জে ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করেছে কাজী বাবলু। তার আতঙ্কে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের একনিষ্ঠ নেতাকর্মীদের অনেকে এখনো এলাকা ছাড়া রয়েছেন। তার বাহিনীর হামলার শিকার হয়ে এখনো হাসপাতালের বেডে কাঁতরাচ্ছেন অনেকে। তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
চন্দ্রগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ বলেন, কাজী মামুনুর রশিদ বাবলুকে ডাকাতি প্রস্তুতি মামলায় গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে।

ইসমাইল হোসেন রবিন/আর এইচ

Comments are closed.