rockland bd

পলিথিন বর্জ্য থেকে তেল

0

ডেস্ক প্রতিবেদন, বাংলাটুডে টোয়েন্টিফোর ডটকম


বাংলাদেশের এক তরুণ উদ্ভাবক পলিথিন বর্জ্য থেকে তেল তৈরির যন্ত্র উদ্ভাবন করেছেন৷ তাঁর এই উদ্ভাবনকে এখন সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়ার কাজ করছে সরকার৷


জামালপুর সদরের মঙ্গলপুর গ্রামের তৌহিদুল ইসলাম তাপস পলিথিন বর্জ্য থেকে তেল তৈরির যন্ত্র উদ্ভাবন করেছেন৷ এ যন্ত্র থেকে এলপি গ্যাস ও কার্বন উৎপাদনও সম্ভব৷ কিন্তু পলিথিন নিয়ে কেন তাঁর আগ্রহ? তৌহিদুল বলেন, ‘‘আমার একটা ফুল বাগান ছিল৷ কিছুদিন পর আমি দেখলাম বাগানের গাছগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে৷ তখন আমি গাছগুলো উপড়ে ফেললাম৷ উঠানোর পরে দেখিসেখানে পলিথিন রয়েছেএবং গাছের শিকড়গুলো পলিথিনে কুণ্ডলী পাকিয়ে গেছে৷ তখন আমি ভাবলাম যে, পলিথিনের কারণেই এই সমস্যা৷ তারপর থেকেই আমি এই পলিথিন নিয়ে কাজ শুরু করলাম৷”

তাঁরই শিক্ষক রসায়ন বিভাগের প্রভাষক মো. ইকরামুজ্জামানের সহযোগিতায় কলেজের গবেষণাগারে এ ব্যাপারে গবেষণা শুরু করেন তাপস৷ দীর্ঘদিন পর আসে সফলতা৷

একসময় নিজ উদ্যোগেই স্বল্প পরিসরে পলিথিন পুড়িয়ে পেট্রোল, ডিজেল, কেরোসিন ও এলপি গ্যাস তৈরি শুরু করেন তাপস৷ জেলা বিজ্ঞান মেলা ও বিভাগীয় বিজ্ঞান মেলায় পুরস্কৃত হয় তাঁর এই উদ্ভাবন৷ জামালপুর শহীদ জিয়াউর রহমান ডিগ্রী কলেজের শিক্ষক মো. ইকরামুজ্জামান বলেন, ‘‘সে আমার কাছে সাজেশন চেয়েছে, আমি দিয়েছি৷ যখন যে সমস্যার কথা আমাকে বলেছে, আমি সেভাবে তাকে সহযোগিতা করার চেষ্টা করেছি৷ আমার পক্ষ থেকে তাকে যতটুকু সাপোর্ট দেয়া দরকার, ততটুকু আমি দিয়েছি৷”

নিজের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে তৌহিদুল ইসলাম তাপস বলেন, ‘‘২০০৯ সালে আমি প্রথমবারের মতো পলিথিন থেকে জ্বালানি গ্যাস উদ্ভাবন পরীক্ষায় সফল হলাম৷ গ্যাসটা যখন রিজার্ভারে জমা করি, তখন দেখি তার নীচে তেলের মতো কিছু জমা পড়েছে৷ পরে বুঝলাম, এটা পলিথিন থেকে উৎপাদিত তেল৷”

পানামার বোকাস দেল তোরো রাজ্যের প্রধান দ্বীপ ইসলা কোলোনের গ্রীষ্মমন্ডলীয় গাছপালার মাঝে দাঁড়িয়ে আছে মধ্যযুগীয় ধাঁচে তৈরি অদ্ভুত এই প্রাসাদটি৷ প্রায় ৪০,০০০ পুরোনো পেট বোতল দিয়ে তৈরি করা হয়েছে এটি৷ কারণ? প্লাস্টিক দূষণের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করা৷

বাংলাদেশ সরকারের এটুআই প্রোগ্রামের দেশসেরা উদ্ভাবকের পুরস্কার পেয়েছেন তাপস৷ এরপর সরকারি অনুদানে জেলা শহরের পৌর বর্জ্য শোধনাগারে স্বল্প পরিসরে বসিয়েছেন পলিথিন থেকে তেল উৎপাদনের প্ল্যান্ট৷ এর দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা ১০৫ লিটার বলে জানান তাপস৷ তিনি বলেন, ‘‘রিয়্যাক্টর চেম্বারে পলিথিন ভরে এয়ারটাইট করে ঢাকনা লাগিয়ে দিই৷ তারপর সেখানে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় তাপ প্রয়োগ করি৷ তাপের ফলে পলিথিন গলে কেমিক্যাল রিয়্যাকশনের মাধ্যমে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের বাষ্প উৎপাদন হয়৷ সে তেল ও গ্যাসের বাষ্প একসাথে মিশ্রিত হয়ে সেখান থেকে আমাদের কনডেন্সারে আসে৷

কনডেন্সার থেকে তা আবার চলে আসে ইভাবরেটরে৷ এখানে আসার পর জ্বালানি গ্যাসের বাষ্প ঠান্ডা হয়ে তরলে রূপ নেয়৷ আর গ্যাস ঠান্ডা হলেও উপর দিকে উঠে যায়৷ তখন নীচে জমে থাকা তরল আস্তে আস্তে আউটপুট লাইন দিয়ে রিজার্ভারে জমা হয়৷”

পরিপূর্ণভাবে চালু হলে এ প্ল্যান্ট থেকে তিন ধাপে তরল, গ্যাস ও কার্বন সংগ্রহ করা সম্ভব হবে৷ তরুণ এই উদ্ভাবকের ইচ্ছা ৫ হাজার লিটার ধারণক্ষমতা সম্পন্ন একটি প্ল্যান্ট স্থাপন৷ তৌহিদুল ইসলাম তাপস বলেন, ‘‘ক্রুড অয়েল আমাদের ঐ মেশিনে নেয়ার পর নির্দিষ্ট একটা তাপমাত্রায় হিট করার পর পেট্রোল পাচ্ছি, আবার তাপ বাড়ালে ডিজেল পাচ্ছি, তখন আবারও যদি তাপমাত্রা বাড়াই দেখা যায় কেরোসিন বের হচ্ছে৷”

এটুআই সংস্থার ইনোভেশন এক্সপার্ট ফারুক আহমেদ জুয়েল এ বিষয়ে বলেন, ‘‘আমরা তার এই তেলকে ল্যাবে টেস্ট করেছি৷ খুব সুন্দর কিছু রিপোর্ট পেয়েছি৷ আমার মনে হয়, আর অল্প কিছু প্রসেস করলেই এটা দারুণ একটা তেলে রূপান্তর করা সম্ভব৷ আমরা চেষ্টা করছি এটাকে বিভিন্ন জেলায় কীভাবে রেপ্লিকা করা যায়, যাতে করে ঐ সমস্ত জেলার পলিথিনগুলোকে আমরা রি-ইউজ করতে পারি৷ এর সাথে কিছু কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়৷”

পরিত্যক্ত পলিথিন থেকে এমন উদ্যোগ প্রশংসনীয়৷ পলিথিনের এ ধরনের পুনর্ব্যবহারই পারে পরিবেশ দূষণ কমিয়ে আনতে৷ স্থানীয় পরিবেশ কর্মী মো. জাহাঙ্গীর সেলিম এ বিষয়ে বলেন, ‘‘এই পলিথিনের কারণে দুর্ভোগের শিকার সারা দেশবাসী৷ একদিকে তাঁর এই উদ্ভাবনে পলিথিন রিসাইকেল হয়ে সম্পদে পরিণত হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা পাচ্ছে৷”

জামালপুর শহীদ জিয়াউর রহমান ডিগ্রী কলেজের প্রভাষক মো. ইকরামুজ্জামান বলেন, ‘‘তৌহিদুল ইসলামের এই উদ্ভাবনকে যদি আমরা সারাদেশে কাজে লাগাতে পারি, তাহলে স্বল্প খরচে তেল পাবো, যা অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাপক কাজে আসবে৷ ”তাপসের এই আবিষ্কার যদি বড় আকারে রূপ দেয়া যায়, তাহলে একদিকে যেমনপলিথিন বর্জ্যের অভিশাপ থেকে জনগণ রক্ষা পাবে, অন্যদিকে এখান থেকে উৎপাদিত তেল, গ্যাস ও কার্বন দেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণ করবে৷ তাপস বলেন, ‘‘যেহেতু পলিথিন আমাদের দেশ ও পরিবেশের জন্য একটা হুমকি, তাই আমার এখন একমাত্র উদ্দেশ্যই হলো পলিথিনকে নির্মূল করা৷”

এটুআই সংস্থার ইনোভেশন এক্সপার্ট ফারুক আহমেদ জুয়েল বললেন, ‘‘আমরা আমাদের এক্সপার্টদের এ প্রকল্পে ইনভল্ব করেছি, যাতে করে এই প্রজেক্টটাকে সফলভাবে এগিয়ে নেয়া যায় এবং এটা যাতে পরিবেশবান্ধব হয়৷ তৌহিদের এই সাফল্য মানে আমাদের সাফল্য৷”

পানামায় প্লাস্টিকের বোতলের দুর্গ

প্লাস্টিকের দুর্গ


পানামার বোকাস দেল তোরো রাজ্যের প্রধান দ্বীপ ইসলা কোলোনের গ্রীষ্মমন্ডলীয় গাছপালার মাঝে দাঁড়িয়ে আছে মধ্যযুগীয় ধাঁচে তৈরি অদ্ভুত এই প্রাসাদটি৷ প্রায় ৪০,০০০ পুরোনো পেট বোতল দিয়ে তৈরি করা হয়েছে এটি৷ কারণ? প্লাস্টিক দূষণের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করা৷

সমুদ্রের জন্য হুমকি


প্রাসাদটির প্রবেশদ্বার ও ভেতরে নানা চিত্রকর্মে দেখানো হয়েছে কিভাবে বিশ্বের সমুদ্রগুলো প্লাস্টিকের কারণে দূষণের শিকার হচ্ছে৷ গবেষণা দল ‘ফিউচার ওশান’-এর মতে, বছরে ৩০ কোটি টন প্লাস্টিক বর্জ্যের অল্প পরিমাণই প্রক্রিয়াজাত করে পূনর্ব্যবহারযোগ্য করা হয়৷ অপরিশোধিত বর্জ্যের অনেকটুকুই যায় সমুদ্রের জলে, ২০১০ সালে যার পরিমাণ ছিল ৪৮ লাখ টন থেকে ১ কোটি ২৭ লাখ টন পর্যন্ত৷

রবার্টের স্বপ্ন

নয় বছর আগে ক্যানাডার রবার্ট বেজেয়াউ মূলত অবসরের পরিকল্পনা নিয়েই বোকাস দেল তোরোতে এসেছিলেন৷ কিন্তু সেখানে কতটা বর্জ্য উৎপাদিত হয় তা নিয়ে দ্বীপ কর্তৃপক্ষের এক গবেষণায় স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে অংশ নিয়ে বনে যান প্লাস্টিক দূষণবিরোধী প্রচারক৷ তিনি বলেন, ‘‘যদি পৃথিবীর ৭৩০ কোটি মানুষ প্রতিদিন এক বোতল করে পানীয় পান করেন, তাহলে বছরে ২৬ হাজার ৬শ’ কোটি বোতল বর্জ্য তৈরি হয়৷’’

ক্যারিবিয়ান স্বর্গ


বছর বছর মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ক্যানাডা থেকে হাজারো পর্যটক ছুটি কাটাতে আসেন এই দ্বীপপুঞ্জে৷ চমৎকার সব বার ও রেস্টুরেন্টের পাশাপাশি এসব দ্বীপে আছে ম্যানগ্রোভ বন, টলটলে সমুদ্র ও মনোরম সৈকতের মতো প্রকৃতির সমারোহ৷ কিন্তু পর্যটকের স্রোতের কারণে তৈরি হয় প্রচুর বর্জ্য, যার শেষ ঠিকানা হয় সমুদ্র, কারণ, এদের পর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা নেই৷

রবার্টের সংগ্রহ


৬২ বর্গ কিলোমিটারের ছোট্ট এই দ্বীপেই বছরে জমা হয় প্রায় পনের লাখ খালি বোতল৷ রবার্ট এগুলো সংগ্রহ করেন তাঁর নির্মাণ প্রকল্পের জন্য৷ শুধু সাধারণ পানীয়ের বোতলই তিনি ব্যবহার করতে পারেন, কারণ, অন্য বোতলগুলোতে দাহ্য উপাদান থাকে৷

প্লাস্টিক ও লোহার ব্যবহার


প্রথমে লোহার খাঁচায় প্লাস্টিকের বোতলগুলোকে একটার ওপর আরেকটা রাখা হয়৷ এরপর এগুলোর ওপর সিমেন্টের প্রলেপ দিয়ে দেয়াল বানানো হয়৷ প্রতিটি দেয়ালে ৩০০টি অর্ধলিটার বা ১২০টি দেড় লিটারের বোতল আঁটে৷ শুধু মধ্যযুগীয় শৈলীতে বানানো ত্রিকোণ জানালাগুলো এইভাবে তৈরি সম্ভব হয় না৷

স্থাপত্যের নতুন জ্ঞান


এই পদ্ধতিতে খুবই সাধারণ ভবন তৈরি করা সম্ভব, যার জন্য প্রায় ১৪,০০০ বোতল দরকার৷ রবার্ট একটি সেন্টার খুলতে চান, যেখানে তিনি উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কিভাবে কম খরচে প্লাস্টিক বোতলকে নির্মাণসামগ্রী হিসেবে ব্যবহার করা যায়, তার প্রশিক্ষণ দেবেন৷ তাঁর মতে, এর একটা বড় উপকার হলো, বোতলের ভেতরকার বাতাস তাপ প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে৷

তথ্য রিসোর্ট


প্লাস্টিকের দুর্গটি এখনো নির্মিত হচ্ছে৷ এ বছরের শেষ নাগাদ কাজ সমাপ্ত হবে৷ তখন এটি পর্যটকদের জন্য খুলে দেয়া হবে৷ সেখানে তাঁরা এই বর্জ্য সমস্যা সম্পর্কে জানতে পারবেন৷ আর এখান থেকে যে অর্থ উপার্জিত হবে তা দিয়ে প্রশিক্ষণের কাজ শুরু করতে চান রবার্ট৷ তাঁর আশা, বিশ্বের যে অঞ্চলগুলোতে বর্জ্য তৈরি হবেই, সেখানে এগুলো দিয়ে অর্থবহ কিছু করা৷ -ডয়েচে ভেলে

এবিএস

Comments are closed.