rockland bd

দেশে নদী রক্ষায় বেহাল দশা: নীতি, আইন, পরিসংখ্যান সব আছে কিন্তু প্রয়োগ নেই

0


বিটি২৪ রিপোর্ট :
  নদী ও মানুষের জীবন যেন অবিচ্ছেদ্য। এ কথা বাংলাদেশের মানুষের জন্য একটু বেশিই সম্পর্কিত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো নদীমাতৃক বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে দিবসটি। এ বছর বিশ্ব নদী দিবসের মূল প্রতিপাদ্য হলো ‘মানুষের জন্য নদী’। নদী মানেই সভ্যতা, নদী মানেই সংযোগ। নদীই এ দেশের সংস্কৃতি বিনির্মাণ করেছে, জনপদ তৈরি করেছে । নদীর সাথে এদেশের মানুষের সম্পর্ক অতি নিবিড়। কিন্তু এ নদীগুলোই হারিয়ে যেতে বসেছে। আর আমাদের এ নিভু নিভু প্রাণ নিয়ে কোনো রকমে বেঁচে থাকা নদীগুলোকে নিয়ে পরিবেশবাদীসহ সাধারণ মানুষের যতো উদ্বেগ। তবে নদী রক্ষার তৎপরতা সারা পৃথিবী জুড়েই দৃশ্যমান। নদী সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে ১৯৮০ সাল থেকে প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসের শেষ রোববার বিশ্ব নদী দিবস হিসেবে পালন করতে শুরু করে ব্রিটিশ কলম্বিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি। এরপর ২০০৫ সাল থেকে জাতিসংঘের বিভিন্ন সহযোগী সংস্থা দিবসটি পালন করছে। বাংলাদেশে ২০১০ সাল থেকে থেকে রিভারাইন পিপল নামের একটি সংস্থা এ দিবস পালন করে আসছে। ২০০৫ সালে জাতিসংঘ দিবসটি অনুসমর্থন করে।
দেশে নদী ও প্রাকৃতিক জলাধার রক্ষায় সোচ্চার রয়েছেন বিভিন্ন পরিবেশবাদি সংগঠন। এ রকম ৭০টির বেশি সংগঠন, উদ্যোগ ও আন্দোলনের সমন্বয়ে গঠিত বিশ্ব নদী দিবস উদযাপন পরিষদ ২৫ সেপ্টেম্বর শনিবার ‘অনলাইন মার্চ ফর রিভারস’ কর্মসূচি পালন করেছে।
এছাড়া,পরিবেশবাদী যুব সংগঠন গ্রীন ভয়েস এর উদ্যোগে বাংলাদেশের ৫১ টি স্থানে নদী বাঁচাও বাংলাদেশ বাঁচাও,বাংলাদেশের নদী বাংলাদেশের প্রাণ,দেশ বাঁচাতে নদী বাঁচান বিভিন্ন স্লোগান নিয়ে নদী রক্ষায় পদযাত্রা, নদী ভ্রমণ, মানববন্ধন ও র‍্যালি সহ নানান কর্মসূচীর মাধ্যমে দিবসটি পালিত হয়।
গত শনিবার (২৫ সেপ্টেম্বর) জাতীয় প্রেস ক্লাবে বিশ্ব নদী দিবস উপলক্ষে ‘বাংলাদেশ নদী বাঁচাও আন্দোলনের’ এক সভায় বর্তমান জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান এ এস এম আলী কবীর বলেন- প্রতিষ্ঠার সাত বছরের মধ্যে কমিশন ৬০ হাজার দখলদারের তালিকা করেছে। এর মধ্যে ১৮ হাজার উচ্ছেদ হয়েছে। কাজটা কিন্তু সহজ নয়। কারণ আপনারা জানেন নদী দখলদারেরা অনেক শক্তিশালী। তবে আইন তারচেয়েও শক্তিশালী, সরকারের হাত আরও লম্বা। নদী দখল করে কেউ পার পাবেন না। তিনি আরও বলেন, এখন যে দখল-দূষণ দেখছেন, তা কয়েক দশক ধরে চলছে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন মাত্র সাত বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি, সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও উন্নতি হবে। নতুন করে কেউ দখল ও দূষণ করতে পারছে না। পুরোনো দখলদারদের ইতোমধ্যে খবর হয়ে গেছে।
তবে তিনি স্বীকার করেছেন, বর্তমানের নদী রক্ষা কমিশনের হাত আছে, হাতিয়ার নেই। আমাদের কাজ করতে হয় জেলা বা উপজেলা প্রশাসন, বিআইডব্লিউটিএ বা সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে। তাদেরও নানা কাজ থাকে। নদী কমিশনের নিজস্ব জনবল থাকলে পরিস্থিতির আরও দ্রুত পরিবর্তন সম্ভব হতো।

ঢাকার কেরানীগঞ্জে বুড়িগঙ্গা নদীর দুই তীর দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ অভিযান

নদী বাঁচাও আন্দোলনের প্রধান আনোয়ার সাদাত বলেন, সরকারি বিভিন্ন সংস্থার হিসেবে দেশে নদী আছে ২৩০টি, উইকিপিডিয়ায় বলা হয় ৪০৫টি, শিশু একাডেমির বিশ্বকোষে নদীর সংখ্যা বলা আছে ৭০০টি, আমরা বলছি দেড় হাজারের ওপর, আবার কেউ বলেন দুই হাজারের ওপর। নদীর আসলে সংখ্যা কতো? সেটা জাতির সামনে আনতে হবে।
আনোয়ার সাদাত বলেন, অভিন্ন নদী কতোগুলো তা নিয়েও বিভ্রান্তি রয়েছে। সরকারিভাবে বলা হয়, অভিন্ন নদী ৫৭টি। এর মধ্যে তিনটি মিয়ানমারের সঙ্গে, বাকি ৫৪টি ভারতের সঙ্গে। কিন্তু আমরা হিসেব করে ১০৭টি অভিন্ন নদী পাচ্ছি। এই সংখ্যাগুলো প্রকৃতভাবে নির্ধারণ করতে হবে।
পানিসম্পদ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ, ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘সরকার যে প্রতিশ্রুতি দেয়, তা রাখার দায়িত্ব সরকারের। সরকার চালান ব্যবসায়ীরা। স্থানীয় সরকার চালান রাজনৈতিক নেতা ও মাস্তানরা। নদীও দখল করে রেখেছে তারা। তাহলে কে কাকে উচ্ছেদ করবে?’ তিনি হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, ‘আমাদের দেশে নীতি, আইন, পরিসংখ্যান সব আছে। কিন্তু প্রয়োগ নেই।’
উল্লেখ্য, দূষণে-দখলে মৃতপ্রায় নদ-নদী রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। ২৫ বছর মেয়াদি ৪০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণের পাশাপাশি অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত রাখা হয়েছে।
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী সারাদেশে নদী দখলদারের সংখ্যা ৬৩ হাজার ২৪৯। ২০১৯ সালে নদী কমিশনের তত্ত্বাবধানে জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো নদ-নদীর অবৈধ দখলদার চিহ্নিত করা হয়েছিল। তখন সারাদেশে দখলদারের সংখ্যা ছিল ৫৭ হাজার ৩৯০। উচ্ছেদও করা হয় ১৮ হাজার ৫৭৯টি দখল। এরপরেও ওই বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালে সারাদেশে নতুন দখলদারের সংখ্যা পাঁচ হাজার বৃদ্ধি পায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদী দখল-দূষণের দায়ে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দেওয়ার আইন থাকলেও এখন পর্যন্ত কারও দণ্ড হয়নি। হাইকোর্ট নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও প্রাণ পাচ্ছে না নদী। অবৈধ দখল উচ্ছেদের জন্য বছরব্যাপী ব্যাপক কার্যক্রম (ক্র্যাশ প্রোগ্রাম) ঘোষণার মধ্যেও থামছে না দখল।

এবিএস

Comments are closed.