rockland bd

তিস্তার পাড়ের জনবসতির নির্ঘুম একটি রাত

0

মোঃ ইফতেখারুল হক টিটু


নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলার ডালিয়ায় তিস্তায় আকস্মিক নদীর পানি বৃদ্ধিতে আতঙ্কে নির্ঘুম একটি রাত কেটেছে তিস্তাপাড়ের মানুষের। ক্রমাগত ঢলের পানি বাড়ায় রাত জেগে সতর্কাবস্থায় ছিলেন সবাই পরিবার পরিজন নিয়ে। এসময় রাত জেগে অন্যত্র আশ্রয়ের প্রস্তুতিতেও নিচ্ছিলেন এসব গ্রামের অনেক মানুষ। আবার অনেকে রাত জেগে কাজ করেছেন গ্রাম রক্ষা বাধের। তিস্তাপাড়ের এমন নির্ঘুম রাতটি ছিল গত সোমবার। ওই দিন রাত ১১টায় উপজেলার ডালিয়ায় তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে নদীর পানি প্রবাহিত হয়েছিল বিপদসীমার ২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে। তবে রাত ১২টার পর থেকে পানি কমতে শুরু করলে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসব মানুষের মধ্যে।

ভারী বর্ষণ ও উজানের ঢলে গতকাল সোমবার রাত ১২টায় নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ডালিয়ায় অবস্থিত দেশের বৃহৎ সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করে ২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এর পর থেকে পানি কমতে শুরু করলে মঙ্গলবার সকাল ৯টায় সেখানে নদীর পানি বিপদসীমার দুই সেন্টিমিটার ও দুপুর ১২টায় ১০ সেন্টিমিটার এবং বিকাল তিনটা তা আরো নেমে ১৬ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ওই পয়েন্টে পানির বিপদসীমা ৫২ দশমিক ৬০ সেন্টিমিটার।

এলাকাবাসী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানায়, গত সোমবার সন্ধ্যা ৬টার পর থেকে নদীর পানি বাড়তে শুরু করে। নদীর পানি ক্ষণে ক্ষণে বাড়তে থাকলে জেলার ডিমলা উপজেলার পূর্বছাতনাই, খগাখড়িবাড়ি, টেপাখড়িবাড়ি, খালিশা চাঁপানী, ঝুনাগাছ চাঁপানী, গয়াবাড়ি, জলঢাকা উপজেলার, গোলমুন্ডা, ডাউয়াবাড়ি, শৌলমারী ও কৈমারী ইউনিয়নের তিস্তা নদী বেষ্টিত প্রায় ১৫টি চর গ্রামের নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পড়ে। পরিবার পরিজন নিয়ে এসব গ্রামের মানুষ রাত জেগে ঢলের পানি মোকাবেলার প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। অনেকের বাড়িঘরে পানি প্রবেশ করায় উঁচুস্থানে সরে যাওয়ারও প্রস্তুতি চুড়ান্ত করে। তবে মধ্যরাতের পর থেকে পানি কমতে শুরু করলে অনেকটাই স্বস্তি ফিরে আসে।

তিস্তা ব্যারাজের ভাটিতে পূর্বছাতনাই ইউনিয়নের বাইশপুকুর গ্রামের স্কুল শিক্ষক বিপুল চন্দ্র সেন বলেন, সন্ধ্যার পর থেকে আকস্মিক নদীর পানি বাড়তে শুরু করে। ক্রমাগত পানি বাড়ায় আতঙ্ক ছড়িয়ে গ্রামে বসবাসরত ৩শ পরিবারের মাঝে। এসময় গ্রামের স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মিত বাধটি

আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাত ১২টার পর থেকে পানি কমতে শুরু করলেও রাত জেগে বাধের ক্ষতি হওয়া এলাকা সংস্কারের কাজ করতে হয়েছে গ্রামের মানুষকে।

টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের পূর্ব ছাতনাই গ্রামের একরাম আলী (৫০) বলেন, সন্ধ্যায় হুহু করে নদীর পানি লোকালয়ে আসতে থাকে। পানি আসার গতিতে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে গ্রামের মানুষ। নদীর পানি বাড়ার ওই ঘটনাটি রাতে হওয়ায় আরো আতঙ্ক বাড়ে। আমরা ওই রাত জেগে ঢলের পানি মোকাবেলার প্রস্তুতিতে ছিলাম। অপরদিকে খবর আসে গ্রামের সেচ্ছাশ্রমে নির্মিত বাধটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায়। সকলকে রাত জেগে বাধ রক্ষার কাজে ঝাপিয়ে পড়তে হয়েছে।

ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পুর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র সূত্র জানায়, তিস্তা ব্যারাজ পয়েণ্টে নদীর পানি গত সোমবার সন্ধ্যা ৬টায় বিপদসীমা অতিক্রম করে। পানি বেড়ে রাত ১২টায় বিপদসীমার ২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাতি হয়। এরপর থেকে পানি কমতে শুরু করলে মঙ্গলবার সকাল ৬টায় বিপদসীমার ৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সকাল ৯টায় বিপদ সীমার দুই সেন্টিমিটার নীচে নামে। বেলা ১২টায় সেখানে নদীর পানি বিপদসীমার ১০ সেন্টিমিটার নীচ দিয়ে প্রবাহিত হয়।

ডিমলা উপজেলার পুর্ব ছাতনাই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ খাঁন বলেন, সোমবার রাতে নদীর পানি বাড়তে শুরু করলে আমার ইউনিয়নের নদীতীরবর্তী গ্রাম ঝাড়সিংহেশ্বর ও পূর্বছাতনাই গ্রামের মানুষ শতর্কাবস্থায় ছিল। মঙ্গলবার পানি কমায় গ্রামের মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে।

একই উপজেলার টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম বলেন, তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে ইউনিয়নের পূর্বখড়িবাড়ি ও দক্ষিণখড়িবাড়ি মৌজায় পানি প্রবেশ করে। রাতে আকস্মিক নদীতে ঢলের পানি আসায় ওই দুই গ্রামের সহ¯্রাধিক পরিবার পরিস্থিতি মোকাবেলার প্রস্তুতিতে নির্ঘুম রাত কাটায়। পানি তোড়ে পূর্বখড়িবাড়ি গ্রামে সেচ্ছাশ্রমে নির্মিত বাধটির ৪০০ মিটার এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গ্রামবাসী রাত জেগে ওই বাধ রক্ষারয় সচেষ্ট ছিল। মঙ্গলবার পানি কমলে স্বস্তি ফিরেছে মানুষের মধ্যে। তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত বাধটির বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানানো হয়েছে। তিনি দ্রæত সংস্কারের পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।

ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রফিকুল আলম চৌধুরী বলেন, গত সোমবার সন্ধ্যা ৬টায় নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করলে ব্যারাজের সবকটি গেট (৪৪) খুলে রাখা হয়। রাত ১২টায় বিপদসীমার ২০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়। এরপর থেকে কমতে থাকলে মঙ্গলবার বেলা ১২টায় বিপদসীমার ১০ সেন্টিমিটার নীচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে, কোন ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।

এবিষয়ে ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা. নাজমুন নাহার বলেন, গত সোমবার রাতে পানি বাড়লেও আজ মঙ্গলবার নদীর পানি বিপদসীমার নীচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তেমন কোন ক্ষয়ক্ষতির খবর নেই আমদের কাছে। তবে পানি বৃদ্ধির ফলে টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নে সেচ্ছাশ্রমে নির্মিত বাধটির সামান্য ক্ষতি হয়েছে যা সংস্কারের প্রস্তুতি চলছে।

বাংলাটুডে২৪/আর বি

Comments are closed.